বৈশাখের প্রথম প্রভাতে আনন্দে ভাসছে পুরো দেশ, গানের সুরে রঙের ঢেউয়ে বরণ ১৪৩৩

"এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুকে দাও উড়ায়ে"
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর এই আহ্বান যেন আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাংলার আকাশে-বাতাসে। পুরনো জীর্ণতা, ক্লান্তি আর গ্লানি মুছে দিয়ে নতুনের বার্তা নিয়ে এসেছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩।
নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সেজে উঠেছে পুরো বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি, এমনকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষও মিলিত হয়েছেন এক আনন্দ উৎসবে। পুরনোকে পেছনে ফেলে, নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনাকে বরণ করে নিচ্ছে সবাই। প্রকৃতিও যেন আজ নতুন রূপে ধরা দিয়েছে। গাছে গাছে কচি পাতার সবুজ রঙিন ফুলের সমারোহ আর পাখির কূজন, সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই বলে দিচ্ছে আজ পহেলা বৈশাখ।
গ্রামের পথে-প্রান্তরে বসেছে বৈশাখী মেলা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় সড়ক সবখানেই উৎসবের আমেজ। দোকানে দোকানে চলছে হালখাতা, পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন করে ব্যবসার সূচনা। অনেকে পরেছেন নতুন পোশাক লাল-সাদা-সবুজ রঙে রাঙানো আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। কপত-কপতিরা মিলিয়ে পোশাক পরে আড্ডা ও প্রেমে মশগুল হচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি কিংবা রমনার আঙিনায়। আর ফুলের ব্যাবসায় ব্যাস্ততার ছাপ পড়েছে শাহাবাগের ফুল বিক্রেতাদের মাঝেও।
তবে এই দিনটি শুধু একটি নতুন বছরের শুরু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য। ঢাকায় বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ছায়ানট। ষাটের দশক থেকে রমনার বটমূলে তাদের আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আজ একটি জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। রমনা বটমূলের এই আয়োজনকে ঘিরেই ধীরে ধীরে নববর্ষের উৎসব ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ, বাংলা একাডেমি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এখন নববর্ষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ। লোকজ ঐতিহ্যের প্রতীক পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি আর পুরনো বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় বাঙালির শিকড়ের গল্প। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। যা বাঙালি সংস্কৃতির জন্য এক গর্বের অর্জন। আজকের দিনে ঢাকায় বাংলা নববর্ষ মানেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, আর বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক পান্তা-ইলিশ।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একযোগে উদযাপিত হয় পহেলা বৈশাখ। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, কম্বোডিয়া, সুইডেন এসব দেশের প্রবাসী বাঙালিরাও বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়কে ধরে রেখেছেন।
সবশেষে বলা যায়, পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়। এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের প্রতীক। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করার এই মহোৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিটি নতুন বছর মানেই নতুন সম্ভাবনা, নতুন স্বপ্ন, আর নতুন পথচলা।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।

নাজমুল গাজী
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









