বাঙালি সংস্কৃতির চৈত্র সংক্রান্তি পালন

চৈত্র সংক্রান্তি যা বাংলা মাস চৈত্রের শেষ দিনে পালিত হয়, এবং এটি বাংলা বছরের শেষ দিন। এটি মূলত পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এক আনন্দঘন মুহূর্ত। এই দিনটি গ্রামীণ ও শহুরে উভয় সমাজেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
চৈত্র সংক্রান্তির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। প্রাচীনকাল থেকেই এই দিনে মানুষ নানা ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই দিনে বিশেষ পূজা-অর্চনা করেন এবং নিজেদের পাপ মোচনের জন্য গঙ্গা বা অন্যান্য পবিত্র নদীতে স্নান করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে স্নান ও দান-পুণ্য করলে সারা বছরের অশুভ শক্তি দূর হয় এবং নতুন বছর শুভভাবে শুরু হয়।এই দিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের পূর্বপুরুষদের জন্য পিণ্ডী দান করে থাকে। তা ছাড়া এদিনে হালখাতা খোলার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন।
চৈত্র সংক্রান্তি আমাদের জীবনে নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে আসে। পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয় এই দিনটি। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রতিটি শেষের মধ্যেই একটি নতুন শুরুর সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
বর্তমান সময়ে শহুরে জীবনে চৈত্র সংক্রান্তির ঐতিহ্য কিছুটা পরিবর্তিত হলেও এর মূল চেতনা এখনো অটুট রয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই দিনে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যা নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করে। তাই বলা যায়, চৈত্র সংক্রান্তি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনের এই দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘চড়ক পূজা’ ও ‘গাজন’ উৎসব। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই উৎসবগুলো বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। চড়ক পূজায় ভক্তরা বিভিন্ন কষ্টসাধ্য আচার পালন করে নিজেদের ভক্তি প্রকাশ করেন। গাজন উৎসবের সময় লোকজ গান, নাচ এবং নাট্য পরিবেশনা হয়, যাত্রা, পুতুলনাচ,যা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্য প্রকাশ করে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা, তারা বিশ্বাস করেন এই দিনে মঙ্গল এর আশায় পূজা করে থাকে এবং নিরামিষ আহার করে থাকেন। অনেকে মনে করেন এই দিনে তিতা খেলে রোগ প্রতিরোধ কমে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিম পাতা, কাঁচাহলুদ, মেথি পাতার রস, তুলসী পাতার রস খেয়ে থাকেন। তাছাড়া এই দিনে অনেকে সারাদিন বিভিন্ন রকম ৪/৫ রকম শাক, ৫/৬ রকম ভাজা, নিরামিষ ভাজি বা সবজি খেয়ে থাকেন।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর চাকমা সংস্কৃতিতে বর্ষবরণের বড়ো উৎসব ‘বিজু’। ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা। বিজু চাকমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান আনন্দ-উৎসব। এই দিন ভোরের আলো ফুটার আগেই ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে ফুল সংগ্রহের জন্য। সংগৃহীত ফুলের একভাগ দিয়ে বুদ্ধকে পূজা করা হয় আর অন্যভাগ জলেতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বাকি ফুলগুলো দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নববর্ষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়। চৈত্রের শেষ দিনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মূল বিজু পালন করে থাকে। এ বিজুর মূল উপাদান ‘পাজন’।
পাহাড়ি বর্ষবরণের আবহমানকালের বহু ঐতিহ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে চাকমা সংস্কৃতিতে টিকে আছে বিজু উৎসবের এই পাজন রান্না। সূর্যের আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় পাজন তৈরি প্রক্রিয়া শুরু হতে থাকে। বাসার সকলে মিলে পাজন রান্নার সবজি কাটাকুটির পর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে শুরু হয় রান্না। রান্না শেষে ঘরে ঘরে চলে পাজন আপ্যায়ন।

Bithi Rani Mondal
© 2026 Prime Tv. All rights reserved.









