ওমান উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বেসামরিক জাহাজে প্রাণহানির এই ঘটনা প্রায় চার দশক আগে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার স্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারত সরকার অভিযোগ করেছে, চলতি সপ্তাহে ওমান উপসাগর এলাকায় ভারতীয় নাবিক বহনকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় তিন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং একটি তেলবাহী ট্যাংকার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘটনার প্রতিবাদে নয়াদিল্লি দুই দিনের ব্যবধানে দু’বার ভারতে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ অগ্রহণযোগ্য এবং এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

তিন জাহাজে হামলার অভিযোগ

ভারতের দাবি অনুযায়ী, প্রথম হামলার শিকার হয় পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘মারিভেক্স’। এতে ২৪ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। ৮ জুন জাহাজটি অচল হয়ে গেলেও সব নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

দ্বিতীয় হামলা হয় ‘সেত্তেবেল্লো’ নামের আরেকটি পালাউ-নিবন্ধিত ট্যাংকারে। ১০ জুনের ওই হামলায় ২৪ ভারতীয় নাবিকের মধ্যে তিনজন নিহত হন।

তৃতীয় হামলার শিকার হয় গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘জালভির’। এতে ২০ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, হামলাগুলো মার্কিন নৌবাহিনী পরিচালনা করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল এবং অপর একটি জাহাজকে নিয়ম না মানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ফিরে এলো ১৯৮৮ সালের ইরান এয়ার ট্র্যাজেডির স্মৃতি

সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর আবার আলোচনায় এসেছে ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাইয়ের বহুল আলোচিত ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ দুর্ঘটনা।

সেদিন পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স ভুলবশত একটি বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমানকে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান মনে করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে দুবাইগামী বিমানটিতে থাকা ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।

নিহতদের মধ্যে ২৭৪ জন যাত্রী এবং ১৬ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই বিমানে অন্তত ১০ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।

কী ঘটেছিল সেদিন?

ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পারস্য উপসাগর ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স তখন ইরানি গানবোটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে বিমানটি রাডারে ধরা পড়ে। যুদ্ধজাহাজের ক্রুরা সেটিকে একটি ইরানি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান বলে ভুল শনাক্ত করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিমানটিকে ‘শত্রু’ ঘোষণা করে দুটি সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটি আকাশেই বিধ্বস্ত হয় এবং পারস্য উপসাগরে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বিমানের সবাই।

তদন্তে উঠে আসে ভুলের চিত্র

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) ঘটনার তদন্ত করে। তদন্তে দেখা যায়, একাধিক যোগাযোগগত ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি বেসামরিক বিমান চলাচলের যোগাযোগ ব্যবস্থা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। ফলে বিমানটি যে একটি নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট ছিল, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া বিমানটিকে পাঠানো অধিকাংশ সতর্কবার্তা সামরিক যোগাযোগ চ্যানেলে পাঠানো হয়েছিল, যা বেসামরিক বিমানের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।

নতুন প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্র

ওমান উপকূলে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—সামরিক অভিযানে বেসামরিক প্রাণহানির দায় কতটা গ্রহণ করা হয় এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ভারত সরকার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বেসামরিক নৌযান ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তথ্য সূত্র- এন ডি টিভি

প্রাইমটিভি/কেআর