ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে বলে মন্তব্য করেছেন দলনেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ হিসেবে উল্লেখ করে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার কলকাতায় বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে মমতা বলেন, “আমাদের জন্য এটি বাঁচা-মরার লড়াই। কিছু মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়ার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করছে। কিন্তু আমি কর্মীদের ছেড়ে যাব না, কেউ দল ছেড়ে চলে গেলেও আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।”

নির্বাচনের ফলাফলের পর বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল কর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, তাদের পছন্দের স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমাদের মঞ্চ তৈরি কিংবা মাইক ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।”

রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলটির ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন বিদ্রোহী অবস্থানে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির দাবি, দীর্ঘদিনের শাসনামলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জমে থাকা জনঅসন্তোষই নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনাও দলটির দুর্বল অবস্থানের প্রমাণ বলে দাবি করছে বিজেপি।

তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, “যেসব বিধায়ক এখন দলত্যাগের কথা ভাবছেন, তারাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।”

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।

এদিকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তৃণমূলের দুই বিধায়ক বিধানসভার স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেছেন যে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে তৃণমূল। একই সঙ্গে দলের ভেতরের মতবিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে।

উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ভবানীপুর আসনে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন। পরবর্তীতে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মঙ্গলবারের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দোলা সেন উপস্থিত ছিলেন। তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়া অনেক নতুন মুখের অনুপস্থিতি দলটির অভ্যন্তরীণ সংকটের বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিদ্রোহী বিধায়কদের অবস্থান এবং তৃণমূল নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা।

প্রাইমটিভি/কেআর