কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দশ বছরের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করল কানাডা

কানাডা সরকারের নতুন উদ্যোগ 'সবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা'র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স
কানাডা সরকার দেশটির বহুল প্রতীক্ষিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কৌশল প্রকাশ করেছে। আগামী এক দশকে এই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হবে, তার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে এই দলিলে। বৃহস্পতিবার কৌশলটি ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ঘোষণায় কার্নি বলেন, এআই আসা ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। "এটি ইতিমধ্যে আমাদের কাজ, শেখা এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে।" তবে তিনি সতর্ক করেন, এআইকে "আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে "৫১তম রাজ্য" বলতে শুরু করার পর থেকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি দেশটিতে তীব্র হয়ে উঠেছে। নতুন এআই কৌশলে সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দলিলে স্বীকার করা হয়েছে, কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি সার্ভারে রাখছে এবং ওটাওয়া অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে যা কানাডার নিজস্ব নয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার একটি সুরক্ষিত সুপারকম্পিউটার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যা কানাডিয়ান গবেষক ও ব্যবসায়ীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে কম্পিউটিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে বড় পরিসরের ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতির কাছাকাছি থাকার কারণে কানাডা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মেধাবী জনবল ধরে রাখতে পারছে না। "এআইয়ের গডফাদার" খ্যাত নোবেলজয়ী গবেষক জিওফ্রি হিন্টন তাঁর প্রতিষ্ঠান গুগলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আরেক কানাডিয়ান প্রতিভা ইলিয়া সাটস্কেভার ওপেনএআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
এই পরিস্থিতি বদলাতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই-কেন্দ্রিক গবেষণা বৃত্তি ও গবেষণা পদ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিদেশি দক্ষ এআই কর্মীদের দ্রুত স্থায়ী বাসিন্দার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কানাডিয়ান এআই কোম্পানিগুলোতে ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
কৌশলে মোট ২০০ কোটি কানাডিয়ান ডলারের বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবসায় এআই সংযুক্তিতে ৬০০ কোটি ডলার অর্থায়ন, স্বাস্থ্য খাতে ২০০ কোটি ডলার এবং সৃজনশীল কর্মীদের জন্য ৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ১২ শতাংশ কানাডিয়ান ব্যবসায় এআই ব্যবহার করে, এটি ২০৩৪ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৌশলে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন খাতে এআই সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আড়াই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে দ্রুত এআই গ্রহণের ফলে কতটি কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে কৌশলে কিছু বলা হয়নি, যা সমালোচকদের দৃষ্টি এড়ায়নি।
কানাডার স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে জরুরি বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সাধারণ চিকিৎসকের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমানো এবং রোগ নির্ণয়ের মান উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কার্নি উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন-চতুর্থাংশের বেশি দেশ ইতিমধ্যে মেডিকেল ইমেজিংয়ে এআই ব্যবহার করছে।
ভোক্তার গোপনীয়তা ও শিশুর সুরক্ষায় নতুন আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কবে বা কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে কৌশলে কিছু বলা হয়নি। বিষয়টি আলোচনায় আসে যখন জানা যায়, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ট্যামব্লার রিজে গণগোলাগুলির ঘটনার আসামি হামলার কয়েক মাস আগে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে বন্দুকসহিংসতা নিয়ে আলোচনা করেছিল। ওপেনএআই বিষয়টি জানলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করেনি বলে পরে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
বিরোধী কনজার্ভেটিভ দল সমালোচনা করে বলেছে, এই কৌশলে নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই।

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









