গ্রীষ্মের খরতাপের তীব্রতা শুরু হতে না হতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের জনজীবন। অসহনীয় গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের এই সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ী, পর্যটক, এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে দিনের বার ঘন্টায় শহরে বিদ্যুত মিলছে প্রায় ৬ঘন্টা আর গ্রামে পাওয়া যায় ৪ঘন্টারও কম। রাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। প্রতি দেড় থেকে দু'ঘন্টা পর বিদ্যুত গেলে আবার আসে দুই ঘন্টা পর। বিদ্যুতের অনুপস্থিতিতে জেনারেটরে বিকল্প আলো-বাতাসের আয়োজন করার কথা থাকলেও জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতার কারণে সেটাও কন্টিনিউ করা মুশকিল হচ্ছে। কয়লা সংকটের কারণে মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন কম হচ্ছে বলে প্রচার পাচ্ছে। ঠিকমতো বাতাস না মেলায় বিদ্যুত কম আসছে খুরুশকুলের বায়ুবিদ্যুত থেকেও।

আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, গরমের তীব্রতা এখনো শুরু হয়েছে মাত্র। কক্সবাজারে ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখালেও বাতাসে আদ্রতা বেশি থাকায় গরম অনুভূত হয় বেশি। এ পরিস্থিতি আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ ভোগান্তির কারণে লাটে উঠার উপক্রম হয়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য। লোডশেডিংয়ের জ্বালায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ছাড় দিয়েও পর্যটক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে সৈকততীরের হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউসগুলো। এ অবস্থা চলতে থাকলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন পর্যটনসহ সবধরণের ব্যবসা।

তারকা হোটেলগুলোতে উচ্চহর্স পাওয়ারের জেনারেট বিদ্যমান। কিন্তু কয়েক ঘন্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় চলন্ত লিফট। এতে আতঙ্কে পড়েন হোটেলে অবস্থান করা পর্যটকরা। চালু করতে হয় জেনারেটর- বার বার বৈদ্যুতিক ভোগান্তি নিয়ে অনেক অতিথি হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে তর্কে জড়ান। এমন সমস্যা সইতে না পেরে অনেক পর্যটক ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে কক্সবাজার ত্যাগ করছেন।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকার নবী হোসেন (৪৫) বলেন, এ সময়টাতে জনকোলাহল কম-রুম ভাড়ায় সাশ্রয় থাকে, এটা মাথায় রেখে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম- কিন্তু যেভাবে বিদ্যুতের যাওয়া-আসা ভ্রমণ আনন্দটাই নষ্ট হচ্ছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আসা রায়হান ফারদিন (৩৯)বলেন, অবকাশ যাপনে কক্সবাজারই প্রথম পছন্দ পরিবারের। হোটেলে বিদ্যুৎ যতক্ষণ থাকে আরাম মিলে কিন্তু বিদ্যুত চলে গেলে জেনারেটর দিতে দেরি করছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ করা হলে বলে, ডিজেল মিলছে না- তাই ভোগান্তি হচ্ছে। গরমে এভাবে থাকা কষ্টকর। দিনের ২টা থেকে রাত ১০টার ভেতর ৪-৫বার আসা-যাওয়া করেছে বিদ্যুৎ।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা রিয়াজ মাহমুদ (৪৩) বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট গরমের ভোগান্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। টেকনাফ-ইনানী ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছি। কক্সবাজার শহরে এসেও একই অবস্থায় পড়ে দুদিন আগেই কক্সবাজার ছাড়ছি।

কক্সবাজার পৌরসভার তারাবনিয়ারছড়ার গৃহবধু সুমাইয়া সাদিয়া বলেন, গত পক্ষকালের বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে অস্বস্তিতে রয়েছি। দিন-রাত সমানতালে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। ঘন্টা-দেড়েক বিদ্যুৎ থাকলেও একবার গেলে মিনিমাম ২ঘন্টা বিদ্যুৎ আসে না। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময়েও একাধিকবার বিদ্যুৎ যায়। বাচ্চাদের ঘুমপাড়াতে কষ্ট হয়। তাদের গায়ে ঘামাচি উঠছে, সর্দি-কাশির প্রভাব বাড়ছে।

ঈদগাঁওর ভাদিতলার গৃহিনী তানিয়া আতাউল বলেন, বিদ্যুতের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হয়। ২৪ঘন্টায় সবমিলিয়ে ৮ঘন্টাও মিলেনা বিদ্যুত। যখনই বিদ্যুত মিলে মোবাইল সার্জ দেয়া, মটরে পানি তোলাসহ বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সকল কাজগুলো নির্ঘুম থেকেও করে নিতে হয়। এমন ভোগান্তি অতীতে পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ঈদগাঁও জোনের এজিএম মো. আলমগীর কবির বলেন, ঈদগাঁও জোনের আওতায় ৬২ হাজার ৫০০ গ্রাহকের (ঈদগাঁও +বাইশারী উপকেন্দ্র) বিদ্যুতের চাহিদা ১৮/১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ মিলে ৮ বা ৯ মেগাওয়াট। বরাদ্দ লোড অর্ধেক পেলেও ১ঘন্টা পরপর বিদ্যুৎ দেওয়া যেত। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। সমস্যা নিরসনে এনার্জী সেভিং বাতি ব্যবহার করে ফ্যান, এসি, রাইছ কুকার, হিটার ব্যবহার পরিহার করা উত্তম। সংকট মোকাবেলায় সবার আন্তরিক হওয়া উচিত।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে পর্যটন খাতে ধস নামছে। পর্যাপ্ত ছাড়েও পর্যটক ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পর্যটকরা নির্ধারিত দিনের আগেই হোটেল ছাড়ছেন। পর্যটক কম হলেও হোটেল সচল রাখতে জেনারেটরে প্রতিদিন ১০০-২০০ লিটার জ্বালানি তেল খরচ হচ্ছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তারকা হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, হাতির দাঁত ধরার মতো অবস্থায় রয়েছি তারকা হোটেল কর্তৃপক্ষ। অতিথি থাক বা না থাক মেনটেনেন্স ঠিক রাখতে হয়। দিনে-রাতে অসংখ্যবার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করছে। প্রয়োজনীয় লিফ্ট ও অন্যান্য সেবা সচল রাখতে কোটি টাকা দামের জেনারেটর চালাতে হয়। ক্ষণে ক্ষণে মেশিন চালাতে গিয়ে নানা পার্টস ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০-২৫০লিটার জ্বালানির যোগান দিতে হচ্ছে। লোডশেডিং ভোগান্তিতে ডিসকাউন্টেও পর্যটক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যারা কয়েকদিন থাকার পরিকল্পনায় আসছেন তারা এক বা দুদিন পর ফিরে যাচ্ছেন।

গরমের তীব্রতা আর লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন সৈকতপাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। পর্যটক না থাকায় খালি পড়ে আছে ট্যুরিস্ট জিপ। অলস সময় পার করছেন ইজিবাইক চালকরা। বার্মিজ পণ্যের দোকানিসহ অন্যরা গুনছেন লোকসান। বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে ডাব। দুঃখের শেষ নেই হকারদেরও।

মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, তারকা হোটেলে ছাড়া অন্য হোটেলে জেনারেটর দিয়ে এসি চালানো অসম্ভব। মাঝারি মানের হোটেলগুলোতে আলো ও ফ্যান সচল রাখতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার জ্বালানি দরকার। জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে আর্থিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, লোডশেডিংয়ের জ্বালায় প্রতিদিনই পর্যটন খাতে কয়েক কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ঘাটতির মধ্যেও সমন্বয় করে পর্যটন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

সূত্র মতে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে চলতি বছর জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব পর্যটন খাতের পাশাপাশি পড়েছে কৃষি খাতেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় ৭ হাজার ১৪৬টি সেচপাম্প রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ডিজেলচালিত এবং বাকি ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেলনির্ভর। কৃষি সমিতির নেতাদের দাবি, জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি সেচপাম্প বন্ধ রয়েছে। এতে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে, যা এখন ঝুঁকির মুখে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গণি বলেন, কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের জন্য দৈনিক চাহিদা ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সরবরাহ মিলছে ৩০-৩৫ মেগাওয়াট। অফিস-আদালত খোলা থাকলে চাহিদা তীব্র হয়। প্রতিদিন ১৫-২০ মেগাওয়াট কম পেলে পৌরসভা ও পিডিবি এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হয়। পর্যটন এলাকা বিবেচনায় আমরা লোড ম্যানেজমেন্ট ও মনিটরিং করছি এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মকবুল আলম জানান, সমিতির আওতায় প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পিক আওয়ারে ১৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রতিদিনই ঘাটতি থাকে ৩৫-৫০ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিং দেয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। সারা দেশে একই পরিস্থিতি চলছে।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, চাহিদা আর সরবরাহের বড় ঘাটতিতে লোডশেডিং বাড়ছে। এতে পর্যটন শিল্পসহ সকল উৎপাদনমূখী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।