এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে রাতের শেষ আড্ডা, বাঙালির অনুভূতির সঙ্গে যেন মিশে আছে এই ছোট্ট পেয়ালা। বৃষ্টি হলে চা, ক্লান্তি এলে চা, গল্প জমলে তো কথাই নেই। শুধু পানীয় নয়, চা যেন আমাদের সংস্কৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পানির পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পান করা হয় চা। আর সেই চায়ের ইতিহাসও হাজার বছরের পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চীনের সম্রাট শেন নুংয়ের ফুটন্ত পানিতে হঠাৎ উড়ে এসে পড়ে চা পাতার কয়েকটি কুঁড়ি। সেখান থেকেই শুরু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটির যাত্রা।

সময়ের সঙ্গে চা ছড়িয়ে পড়ে চীন থেকে জাপান, ইউরোপ হয়ে পুরো বিশ্বে। আর ব্রিটিশদের হাত ধরে ভারত উপমহাদেশে শুরু হয় বাণিজ্যিক চা চাষ। সেই ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় বাংলাদেশের চা শিল্পের সবুজ সাম্রাজ্য।

বাংলাদেশে প্রথম চা বাগানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম আর এখন উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ সমতলেও ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের সবুজ কার্পেট।

বর্তমানে দেশে রয়েছে ১৭১টির বেশি বাণিজ্যিক চা বাগান। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। শুধু উৎপাদনই নয়, দেশের চায়ের স্বাদ ও মানও আন্তর্জাতিক বাজারে দিন দিন বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের পরিচিতি।

বিশেষ করে পঞ্চগড়ের সমতলের চা এখন নতুন সম্ভাবনার নাম। এক সময় যে অঞ্চলে শুধু ধান আর ভুট্টা দেখা যেত, আজ সেখানে চোখজুড়ানো চা বাগান। উত্তরবঙ্গের চা এখন দেশের মোট উৎপাদনের বড় একটি অংশ জোগান দিচ্ছে।

তবে এই শিল্পের পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমিকের ঘাম আর নিরলস পরিশ্রম। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে দুই কুঁড়ি এক পাতার সেই সংগ্রহই পৌঁছে যায় আমাদের প্রতিদিনের চায়ের কাপে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পড়ছে চা শিল্পে। অনিয়মিত বৃষ্টি আর অতিরিক্ত তাপমাত্রা উৎপাদনে তৈরি করছে নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব চা শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতি বছর ২১ মে পালিত হয় আন্তর্জাতিক চা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, “প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করা”। যার মূল লক্ষ্য চা শিল্পের শ্রমিক, ক্ষুদ্র চাষি এবং নারী কর্মীদের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এক কাপ চা শুধু ক্লান্তি দূর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি আর কোটি মানুষের জীবিকার গল্প। তাই আন্তর্জাতিক চা দিবসে বাংলাদেশের সব চা প্রেমীদের জন্য বার্তা, চায়ের স্বাদ যেমন উপভোগ করবো, তেমনি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর পরিশ্রমকেও সম্মান জানাবো।

প্রাইমটিভি/এনজি