বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা এখন একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ইসলামী শরিয়া আইনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধর্ষণের শিকার কোনো নারীকে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হয় এবং তারপর ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া হয়। এই বিধানটি আসলে কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা জাকির নায়েকের কাছে প্রশ্ন করা হয়।

আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন হুদা টিভির এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ডা. জাকির নায়েককে জিজ্ঞেস করা হয়, ধর্ষণের শিকার কোনো নারীর কাছে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী চাওয়া এবং তারপর ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত কিনা।

উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, অনেক উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, অনেক মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে, ইসলামি আইনে ধর্ষণ প্রমাণ করতে চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। এটি সঠিক নয়। তিনি বলেন, মানুষ আসলে ব্যভিচার বা জিনার অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সঙ্গে ধর্ষণের বিষয়টি গুলিয়ে ফেলে।নো ব্যক্তি যদি কোনো নির্দোষ নারীর বিরুদ্ধে জিনা বা ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, তবে তার অভিযোগ প্রমাণ করতে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। যদি সে চারজন সাক্ষী আনতে না পারে, তবে উল্টো অভিযোগকারীকে ৮০টি দোররা বা বেত্রাঘাত করা হবে। সুতরাং, এই চারজন সাক্ষীর শর্তটি কেবল ব্যভিচারের অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি কেউ দাবি করে যে অমুক পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করেছে, তবে তা প্রমাণ করতে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী লাগবে।কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কারণ ধর্ষণ এবং জিনা বা ব্যভিচার পুরোপুরি আলাদা বিষয়। জিনা বা ব্যভিচার সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে, পক্ষান্তরে ধর্ষণের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কটি একজনের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এ ধরনের জোরপূর্বক অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদগণ পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। যেখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং জমিনে ফাসাদ বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড, অথবা ক্রুশবিদ্ধকরণ, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত ও পা কেটে ফেলা, অথবা দেশান্তর/নির্বাসন।

এই আয়াতে মূলত ‘হিরাবাহ’ বা নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যেমন অস্ত্রের মুখে কাউকে জিম্মি করা। ইসলামি আইনবিদদের মতে, ধর্ষণও নৈরাজ্য বা সন্ত্রাসের মধ্যে পড়ে, কারণ ধর্ষণের সময়ও কাউকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়।

ধর্ষণের অপরাধ যদি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। হিরাবাহর ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর দরকার নেই, দুইজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এমনকি পরিস্থিতিগত বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণও গ্রহণযোগ্য। বিচারক যদি সব প্রমাণ দেখে নিশ্চিত হন, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

যদি বিচারক পুরোপুরি নিশ্চিত না হন, তাহলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী নমনীয় শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, যেমন কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত বা অন্য কোনো শাস্তি। তবে কোরআনে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা ক্রুশবিদ্ধকরণের মতো কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

বিচারক যদি মনে করেন সমাজে উদাহরণ তৈরি করা দরকার, তাহলে অপরাধীকে ক্রুশবিদ্ধ করা যেতে পারে। এটি করা হয় হয়তো মৃত্যুদণ্ড দিয়ে লাশটি জনসম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা, অথবা জীবিত অবস্থায় খুঁটিতে বেঁধে রাখা। আরও শাস্তির মধ্যে রয়েছে হাত ও পা কেটে ফেলা বা নির্বাসন ও কারাদণ্ড। তবে অপরাধ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হলে, মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হয় এবং এই ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট, চারজন সাক্ষীর দরকার নেই।

ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফেঈ (রহ.) মনে করেন, ধর্ষককে শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীকে উপযুক্ত মোহর বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অন্যদিকে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও সুফিয়ান সাওরী (রহ.) মনে করেন, শুধু আইনি শাস্তিই যথেষ্ট। তবে সবাই একমত যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর শর্ত নেই, পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট।

স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগে মদিনায় একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, যা সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে। এক নারী অন্ধকার রাতে মসজিদের দিকে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন। পথে এক ব্যক্তি তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে ধর্ষণ করে। নারীটি চিৎকার ও সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকেন, কিন্তু ধর্ষক অপরাধ শেষে পালিয়ে যায়। এরপর অন্য এক ব্যক্তি সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ভুক্তভোগী নারী তাকে বলেন যে একজন তার সম্ভ্রমহানি করে ওই দিকে পালিয়ে গেছে। সেই ব্যক্তি তখন ধর্ষককে ধরার জন্য তার পিছু নেন।

এদিকে ওই নারী অন্য একদল মানুষের কাছে গিয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার কথা বলেন। তখন সেই লোকেরা গিয়ে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে ধরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে নিয়ে আসে। ভুক্তভোগী নারীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি ওই ব্যক্তিকে দেখে বলেন, ‘হ্যাঁ, এই লোকটাই আমাকে ধর্ষণ করেছে।’ কিন্তু সে প্রকৃত অপরাধী ছিল না। যখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে যাবেন, তখন প্রকৃত অপরাধী নিজে থেকে সামনে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে ধর্ষণ করেছি।’তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দোষ লোকটির কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তাকে ছেড়ে দেন। ভুক্তভোগী নারীকে বলেন, ‘তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।’ কারণ ভুলবশত তিনি প্রথম ব্যক্তিকে ধর্ষক মনে করেছিলেন, তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না বা তিনি স্বেচ্ছায় এটি করেননি। আর যিনি প্রকৃত ধর্ষক ছিলেন এবং নিজে এসে অপরাধ স্বীকার করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ধর্ষণ প্রমাণে ভুক্তভোগী নারীর কাছে চারজন সাক্ষী চাননি। এখানে পরিস্থিতিগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট ছিল, যদিও রায় দেওয়ার আগে অপরাধী নিজেই দোষ স্বীকার করেছিল।

তাই রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগ থেকেই স্পষ্ট, ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণে চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক নয়। এটি ভুল ধারণা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণই যথেষ্ট এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে অপরাধ শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, না হলে শাস্তি কিছুটা কম হতে পারে।

প্রাইমটিভি/এমএইচ