ফাহিম মুনতাছিম, কুমিল্লা প্রতিনিধি।

কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডে চার সন্দেহভাজনকে আটক করেছে র‍্যাব। একই সঙ্গে পুলিশ ও র‍্যাবের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় চারজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে র‍্যাব-১১। আটকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রবিবার (২৬ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে র‍্যাব-১১-এর কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, শনিবার রাত থেকে রবিবার এই সংবাদ লিখা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানায় র‍্যাব।

অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম একযোগে কাজ করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালাচ্ছি এবং দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছি।

নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) হিসেবে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন এবং কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় বসবাস করতেন।

কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান জানান, বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামে ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গত ১১ এপ্রিল সেখানে যান। প্রশিক্ষণ শেষে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

পথে পরিবারের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সবশেষ রাত ১টা ২৫ মিনিটে তিনি ফোনে জানান, কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন তিনি। এরপর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরদিন শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ৮টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় আইরিশ হোটেলের পাশে তার রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা হাইওয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।

রবিবার (২৬ এপ্রিল) কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ কুমিল্লা কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে সহকর্মীরা ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

পরে দুপুর ১২টায় মরদেহ নিজ বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়ার সময় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বামীর লাশবাহী গাড়ির সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হীরা।

স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, আমি শুধু আমার স্বামীর রক্তাক্ত শরীর দেখেছি। অনেকে অনেক কথা বলছেন। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কী আসবে, তদন্ত কী বলবে—এসবের বাইরে আমার একটাই প্রশ্ন, আমার স্বামীর সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? আমি শুধু সেটার উত্তর চাই।

নিহতের মা নিলীমা বৈরাগী ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

এদিকে, কাস্টমস বিভাগ জানিয়েছে, বুলেট বৈরাগীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে এ মৃত্যু—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিতে সহকর্মী, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।