পরিবেশজুড়ে সীসার দূষণ, হুমকির মুখে শিশুস্বাস্থ্য

প্রতীকী ছবি
শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। অথচ বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু বেড়ে উঠছে এক নীরব বিষের ছায়ায়। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ইউনিসেফের উদ্যোগে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। অধিকাংশ শিশুর রক্তে পাওয়া গেছে বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি। যা তাদের মেধা, আচরণ ও স্বাভাবিক বিকাশকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীসা দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
১০০% শিশুর রক্তেই বিষের উপস্থিতি
আইসিডিডিআর,বি-র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকার ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে ১০০% শিশুর রক্তেই সীসার ক্ষতিকর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক ওপরে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু সীসা সংশ্লিষ্ট শিল্প এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে, তাদের রক্তে সীসার পরিমাণ অন্য শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

রক্তে সীসার উপস্থিতি ও ঝুঁকির চিত্র
• ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলা: ৫৪% থেকে ৭৮% শিশুর রক্তে উচ্চ সীসা।
• টঙ্গী শিল্প এলাকা: ১০৫ জনের মধ্যে ১০৪ জনের রক্তেই মাত্রাতিরিক্ত সীসা।
• ঢাকার স্কুলগামী শিশু: ৯০% শিশুর রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি সীসা।
• ঢাকার ২-৪ বছর বয়সী শিশু: ১০০% শিশুর রক্তেই সীসার উপস্থিতি।
অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও অনিরাপদ খাবার
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সীসাযুক্ত পেট্রোল নিষিদ্ধ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ালেও, বর্তমানে সীসা দূষণের প্রধান উৎস বদলে গেছে।
• অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং: ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ভেঙে সীসা গলানো হচ্ছে। ঢাকার ইসলামবাগ এবং কামরাঙ্গীরচর এই দূষণের অন্যতম হটস্পট।
• খাবারের মাধ্যমে বিষক্রিয়া: শুধু বাতাস বা পরিবেশ নয়, সীসা এখন ছড়াচ্ছে শিশুর খাবারেও। অতিরিক্ত ফরমালিনযুক্ত অনিরাপদ খাবার, বাইরের অস্বাস্থ্যকর ফাস্ট ফুড এবং প্রিজারভেটিভযুক্ত জাঙ্ক ফুডের মাধ্যমেও সীসা ও অন্যান্য ক্ষতিকর ভারী ধাতু শিশুদের শরীরে প্রবেশ করছে।
• অন্যান্য উৎস: সীসা দিয়ে ঝালাই করা টিনের ক্যান, সিরামিক ও সিমেন্ট কারখানার নির্গমন এবং আবাসিক এলাকায় ব্যবহৃত রঙ।
আইসিডিডিআর,বি-র এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইউনিটের তথ্যনুযায়ী সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে সীসা-সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোই শিশুদের মধ্যে এই বিষ ছড়ানোর প্রধান উৎস। অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।

কমছে মেধাশক্তি এবং ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর শরীরে প্রবেশ করার পর সীসা মূলত ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করে এবং মস্তিষ্কের 'প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স' অংশটিকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে শিশুদের মনোযোগের অভাব, আবেগ নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং আচরণগত পরিবর্তন ঘটে, যা আর কখনো নিরাময় করা সম্ভব হয় না।
অর্থনীতিবিদ বিয়র্ন লারসেনের গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে সীসা দূষণজনিত স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি ছিল প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমতুল্য। শুধু শিশুদের আইকিউ কমে যাওয়ার কারণে কর্মজীবনে যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে, তার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।
অবৈধ ব্যাটারি গলানো, শিল্প বর্জ্য ও অনিরাপদ খাবার (ফাস্ট ফুড/ফরমালিন)
⬇
মাটি, বাতাস ও খাদ্যে দূষণ
⬇
শিশুর শরীরে প্রবেশ (ক্যালসিয়ামের ছদ্মবেশে)
⬇
মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ধ্বংস
⬇
স্থায়ীভাবে আইকিউ হ্রাস ও আচরণগত বিপর্যয় (ক্ষতি ১৬ বিলিয়ন )
অতীতে সাফল্য থাকলেও বর্তমানে স্থবিরতা
২০১৯ সালে হলুদে সীসার ভেজাল (লেড ক্রোমেট) বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে মাত্র দুই বছরে তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ, যা বিশ্বজুড়ে এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু ব্যাটারি রিসাইক্লিং খাতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, নিরাপদ নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ এবং লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের ব্যাপক চাহিদার কারণে এই সংকট দূর করা যাচ্ছে না। একই সাথে খাদ্য সুরক্ষায় দুর্বল নজরদারি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

২০৩৫ সালের পরিকল্পনা ও আশার আলো
অবশেষে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কিছু ইতিবাচক তৎপরতা শুরু হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ডা. ফাহমিদা খানম জানিয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় করতে একটি বহুপাক্ষিক স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর কাছে প্রয়োজনীয় তহবিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে এবং নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাগজের পরিকল্পনা দ্রুত মাঠে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
প্রাইমটিভি/এনজি

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









