দেড় কোটি মানুষের শহরে আড়াই লাখ বিড়ালের দাপট

ইস্তাম্বুলের বিড়াল । সংগৃহীত
‘গোলাপি শহর’, ‘হ্রদের শহর’ কিংবা ‘মসজিদের শহর’ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরকে আমরা এমন কত নামেই না চিনি। কিন্তু কখনো কি শুনেছেন ‘বিড়ালের শহর’ এর কথা ? প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি না থাকলেও, ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থল এবং তুরস্কের অন্যতম ব্যস্ত নগরী ইস্তাম্বুলকে ডাকা হয় বিড়ালের শহর বা 'ক্যাটেস্তাম্বুল' নামে।
প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই মেগাসিটিতে মানুষের পাশাপাশি বুক ফুলিয়ে বাস করছে প্রায় আড়াই লাখ বিড়াল। এরা কেবল রাস্তার সাধারণ কোনো প্রাণী নয়, বরং ইস্তাম্বুলবাসীর দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যেখানে মানুষের মতোই নাগরিক বিড়ালেরা
ইস্তাম্বুলের রাস্তায়, মসজিদের প্রাঙ্গণে, মেট্রো স্টেশনে, ঐতিহাসিক স্থানে কিংবা আধুনিক কফিশপে, সবখানেই এই বিড়ালদের অবাধ বিচরণ। ইস্তাম্বুলের মানুষের ভাষায় “ইস্তাম্বুলের বিড়ালেরা তাদের চেনা কোন সাধারণ পোষ্য নয়, আবার অবহেলিত রাস্তার বিড়ালও নয়। তারা মানুষের সঙ্গে চমৎকার সহাবস্থানে থাকে এবং শহরবাসী তাদের নিজেদের পরিবারের মতোই যত্ন নেয়। তারাও মানুষের মতো এই শহরের সমান অংশীদার।”

ইতিহাস কী বলে?
ইস্তাম্বুলের বিড়ালদের সঙ্গে মানুষের এই সখ্যতা কিন্তু আজকের নয়, এর পেছনে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস। ওসমানি যুগে এ শহরের মানুষের মধ্যে রাস্তার বিড়ালদের প্রতি গভীর মমতা ছিল। তখন বিড়ালদের খাওয়ানো 'ম্যানকাজি' নামে একটি জনপ্রিয় পেশা ছিল।
এছাড়া রোমান ও ওসমানি যুগে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যখন ইস্তাম্বুলে আসত, তখন ফিনিশীয়রা জাহাজে ইঁদুর দমনের জন্য বিড়াল রাখত। বন্দর নগরী হওয়ায় সেই বিড়ালগুলো একসময় ইস্তাম্বুল শহরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়।

কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে অনন্য এক সহাবস্থান
সাধারণত আধুনিক শহর মানেই ইট, পাথর, কংক্রিট আর কাঁচের দেয়াল। যেখানে বন্যপ্রাণী বা পথচারী প্রাণীদের টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু ইস্তাম্বুল এর ব্যতিক্রম। শহরের তীব্র ব্যস্ততা, যানজট আর কোলাহলের মাঝেও এই আড়াই লাখ বিড়াল দারুণ নিরাপদে জীবন কাটাচ্ছে।

কেন ইস্তাম্বুলের বিড়ালেরা এত সুখী?
• খাদ্য ও পানি: শহরের প্রায় প্রতিটি বাজার, মেট্রো স্টেশন বা কফিশপের বাইরে বিড়ালদের জন্য খাবারের বাটি ও বিশুদ্ধ পানি রাখা থাকে।
• স্থানীয়দের ভালোবাসা: দোকানদার থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী সবাই নিজের খাবারের অংশ ভাগ করে নেন এদের সাথে।
• চিকিৎসা ও আশ্রয়: বিড়াল অসুস্থ হলে স্থানীয়রাই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
শহরের ঐতিহাসিক এলাকা যেমন; ফাতিহ, ব্লু মসজিদ বা হাগিয়া সোফিয়ার আশপাশে এদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। অনেক পর্যটক এখানে আসেন কেবল এই বিড়ালদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং ছবি তুলতে। কৌতুক করে অনেকেই এদের বলেন 'প্রফেশনাল পোজার'।

'ক্যাটেস্তাম্বুল' থেকে পৃথিবীর শেখার আছে অনেক কিছু
ব্যস্ত জীবনের হাহাকার আর ভিড়ের মাঝে এই ছোট ছোট তুলতুলে প্রাণীরা ইস্তাম্বুলবাসীর জীবনে বয়ে আনে অনাবিল শান্তি ও মানসিক স্বস্তি।
ইস্তাম্বুল বিশ্বকে এক অনন্য বার্তা দেয় এই পৃথিবী শুধু মানুষের একার নয়। ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গেও যে শান্তিপূর্ণভাবে স্থান, খাদ্য ও জীবন ভাগ করে নেওয়া যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই শহর। ভালোবাসা, যত্ন আর সহমর্মিতার মাধ্যমে একটি যান্ত্রিক শহরও যে কতটা মানবিক ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে, 'ক্যাটেস্তাম্বুল' তারই এক অনন্য উদাহরণ।
প্রাইমটিভি/এনজি

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









