শিল্পখাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, ছাঁটাই আতঙ্কে হাজারো শ্রমিক

পোশাক শ্রমিক । সংগৃহীত
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অর্ডার কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের শিল্পখাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ। ফলে চাকরি হারানোর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরে ব্যবসায়িক পরিবেশে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি শিল্পখাত। পোশাক শিল্প মালিকরা বলছেন, অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। ফলে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়ে জনবল সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
সাভার: চাকরি হারিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ
ঢাকার সাভারে সম্প্রতি আল-মুসলিম গ্রুপের ৭টি পোশাক কারখানা থেকে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রম আইন অনুসরণ না করা এবং পাওনা পরিশোধ না করার অভিযোগ এনে শ্রমিকরা সাভারের রেডিও কলোনি, উলাইল ও আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করছেন। চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনেও অবস্থান নিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

নারায়ণগঞ্জ: ২ হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই, বাড়ছে অস্থিরতা
নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় প্রায় ১,৮৩৪টি পোশাক কারখানা থাকলেও ছোট কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জেলা কমিটির তথ্যমতে, গত কয়েক মাসের ব্যবধানে জেলাটিতে ২ হাজারেরও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। ঈদের পর ‘ইউনাইটেড গার্মেন্টস’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ‘আবির ফ্যাশন’ সহ একাধিক কারখানায় বড় অঙ্কের ছাঁটাই হয়েছে। অর্ডার না থাকার অজুহাতে অনেক শ্রমিককে মৌখিকভাবে কাজ খুঁজতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম: লোকসানে বন্ধ হচ্ছে কারখানা
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বর্তমানে ৪৬০টি মাঝারি পোশাক কারখানা চালু আছে। লোকসানের কারণে গত এক বছরে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কালুরঘাট এলাকার একটি বড় কারখানার শ্রমিকরা দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন এবং তাদের অন্যত্র চাকরি খোঁজার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর: ১৯ কারখানায় ছাঁটাই
চলতি বছরের ১৭ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত গাজীপুর জেলার চান্দনা, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, কাশিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ১৯টি কারখানার ৫৬০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে কর্তৃপক্ষ। গাজীপুর শিল্প পুলিশ জানায়, কাজের অর্ডার কম থাকা, শ্রম অসন্তোষ এবং নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে কর্মরত বাকি শ্রমিকদের মধ্যেও ছাঁটাই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রমিক ছাঁটাই করে না। তবে ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি কঠিন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তবে শ্রমিক ছাঁটাই করা হলে তাদের সব পাওনা যথাযথভাবে পরিশোধ করা উচিত।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পরিচালক মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রম আইন অনুসরণ করেই অধিকাংশ কারখানায় ছাঁটাই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ বা অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও মধ্যস্থতার ভূমিকাও পালন করছে শিল্প পুলিশ।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পখাতের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শ্রমিক নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাইমটিভি/এনজি

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









