চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র, তেহরান-ওয়াশিংটনের কে বেশি সুবিধা পেল

ছবিঃসংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে করা ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ)-এর পূর্ণাঙ্গ ১৪ দফা প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (১৬ জুন) মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসের পক্ষে এই নথির বিস্তারিত বিবরণ পড়ে শোনান। শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত চুক্তিতে সই হওয়ার কথা রয়েছে।
১৪ দফার প্রতিটি ধারা প্রকাশের পর বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এখন পুরো বিশ্বের নজর—এই মহানাটকীয় চুক্তিতে আসলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কে বেশি সুবিধা পেল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ স্টাইলে তেহরানের ওপর বড় রকমের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, ওয়াশিংটন অবিলম্বে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার সুবিধা পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কড়া নজরদারিতে ইরান তাদের এযাবৎকালের মজুত করা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করতে বাধ্য থাকবে। চুক্তির ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, চূড়ান্ত আলোচনার ৬০ দিন পর্যন্ত ইরান কোনো নতুন পরমাণু গবেষণা বা সমৃদ্ধকরণ করতে পারবে না।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি, এর মাধ্যমে তারা কোনো যুদ্ধ ছাড়াই ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের লাগাম টেনে ধরতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য এবং নজিরবিহীন। দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় পিষ্ট হতে থাকা ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে কার্যত এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আদায় করে নিয়েছে।
চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে নিয়ে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০ হাজার কোটি বা ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশাল উন্নয়ন তহবিল গঠন করবে। চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ওপর থাকা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আইএইএ এবং আমেরিকার নিজস্ব একতরফা সমস্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে তুলে নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির পাশাপাশি ইরান তাদের বিশ্বজুড়ে জব্দ থাকা কোটি কোটি ডলারের রাষ্ট্রীয় তহবিল ফিরে পাচ্ছে। এমনকি এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও ইরান যেন নির্বিঘ্নে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করতে পারে, সেজন্য মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ছাড়পত্রের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানেও ইরান তাদের মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। চুক্তির প্রথম দফাতেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিকে একতরফাভাবে কারও জয় বা পরাজয় বলা ভুল হবে। এটি মূলত একটি সুনিপুণ ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ বা পারস্পরিক স্বার্থের ডিল। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে তাদের চির শত্রু দেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি রুটের নিয়ন্ত্রণ, আর ইরান তার বিনিময়ে নিশ্চিত করেছে নিজেদের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও নিষেধাজ্ঞা থেকে চিরমুক্তি।
এখন পুরো বিশ্বের নজর আগামী ৬০ দিনের চূড়ান্ত আলোচনার দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ কতটা স্থায়ী রূপ পায়।
প্রাইমটিভি/এমএইচ

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।








