রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ শনিবার দিনভর উত্তেজনা, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে হাতাহাতির অভিযোগের পর মৃত রোগীর ছেলে রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর পর তার মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

স্বজনদের দাবি, অক্সিজেন না দেওয়াসহ চিকিৎসায় অবহেলার কারণে রোগী নূর নাহার বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করেছেন রিফাত হোসেন।

হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোরে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। এরপর চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

চিকিৎসকদের অভিযোগ, এ ঘটনায় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ও ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসান শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। এর প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন এবং হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। ফলে সকাল ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগের সেবা ব্যাহত হয়।

অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, মৃত্যুর পর নূর নাহার বেগমের মরদেহ আইসিইউতে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী বাধা দিয়ে সেটি মর্গে নিয়ে যান।

তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আন্দোলন করা হলেও কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি।

এদিকে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেন হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে সেখানে জড়ো হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা রিফাত হোসেনের প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। পরে পরিচালকের কার্যালয়ের ভেতরে তাকে ১০ বার কান ধরে ওঠবস করানোর পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মরদেহ ফেরতের দাবিতে রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় মৃতের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু অভিযোগ করেন, “ভোরে মা মারা যাওয়ার পরও আমরা তার মুখ দেখতে পারিনি। বারবার ক্ষমা চেয়েও মরদেহ পাইনি।”

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা দেখা গেছে। তিনি ঘটনাটিকে “অত্যন্ত অমানবিক” বলে উল্লেখ করেন।

মরদেহ আটকে রাখা এবং জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহটি মরচুয়ারিতে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে রিফাত হোসেনকে কান ধরে ওঠবস করতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাইমটিভি/কেআর