ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানালেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে বৈঠকের কোনো মানে নেই। শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন এ মন্তব্য করেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি একটি খোলা চিঠিতে পুতিনকে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। চিঠিতে তিনি লেখেন, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে মার্কিন মনোযোগ ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে থাকা ঠিক হবে না। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতিরও দাবি জানান এবং চিঠিতে পুতিনকে উদ্দেশ করে বেশ কড়া ও কৌতুকপূর্ণ ভাষাও ব্যবহার করেন।

পুতিন চিঠিটিকে 'অভদ্র' বলে আখ্যায়িত করে বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাঁর পুরনো অবস্থানে অটল থেকে বলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতির আগে শান্তি আলোচনা হওয়া উচিত। বৈঠকের প্রস্তাব নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, 'এই মুহূর্তে আমি এর কোনো মানে দেখছি না। এটা কি মুখোমুখি বৈঠকের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা, নাকি বৈঠকটি না হওয়ার একটা কৌশল? আমার মনে হয় দ্বিতীয়টাই।'

পুতিনের এই জবাব শোনার পর জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লেখেন, রাশিয়া 'আবার যুদ্ধকেই বেছে নিচ্ছে'। তিনি আরও লেখেন, 'পুতিন শুধু যুদ্ধ শেষ করতে চান না। আমার মনে হয়, তাঁর এই জবাবে বিশ্বের অনেকেই হতাশ হয়েছেন।'

জেলেনস্কির চিঠির বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুতিন আবারও তাঁর পুরনো অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি দিলে ইউক্রেন কেবল নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে, আর মস্কোর দাবিগুলো এখনো পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, 'আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামানোই এর একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে। কিন্তু আমাদের চুক্তি দরকার—ছয় মাসের জন্য নয়, তিন মাসের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি।' তিনি আরও বলেন, বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করুন, কোনো সমাধান খুঁজে বের করুন—তারপর বৈঠক হতে পারে।

পুতিন জানান, রাশিয়ার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামাবেন না। তিনি বলেন, 'সামরিক অভিযান একদিন শেষ হবে, আমরা ধরে নিচ্ছি। নিঃসন্দেহে শেষ হবে—যখন আমরা আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পারব।'

রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চল থেকে সরে আসতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা বাদ দিতে হবে। কিন্তু কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি নয়। ইউক্রেনের যুক্তি, মস্কোকে এখন ছাড় দিলে ভবিষ্যতে আবার আগ্রাসনের পথ খুলে যাবে—বিশেষত ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের আট বছর পর রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ করেছিল সেই অভিজ্ঞতার আলোকে।

জেলেনস্কি তাঁর চিঠিতে পুতিনকে লক্ষ্য করে লিখেছিলেন, '২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়সের ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে।' বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে ইউক্রেনের হামলাকে তিনি 'সফর করে আসা' বলেও উল্লেখ করেন। পুতিন বলেন, চিঠিতে 'বেশ কিছু রুক্ষ মন্তব্য' ছিল।

জেলেনস্কির চিঠির বিষয়বস্তু হোয়াইট হাউসসহ কিছু মহলে শান্তির আশা জাগিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, দুই নেতার বৈঠক হলে 'সেটা চমৎকার হবে'।

এদিকে ইউক্রেন জানিয়েছে, শুক্রবার আজভ সাগর ও রাশিয়া-অধিকৃত উপকূলীয় এলাকায় পাঁচটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন কমান্ডার রবার্ট ব্রভদি বলেন, জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় শস্য 'লুট' করা এবং জ্বালানি ও সামরিক সরবরাহ পরিবহনে জড়িত ছিল। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজভ সাগরে দুটি জাহাজে হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন, তবে হামলাকারী কে তা জানায়নি মন্ত্রণালয়। একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন রোমানিয়ার কনস্তান্তা বন্দরে বিস্ফোরিত হয়েছে; ইউক্রেনীয় অপারেটররা বলছেন, রুশ ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপে ড্রোনটি পথ হারায়।

গত এক দিনে ইউক্রেনে রাশিয়ার একাধিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিয়েভের বাইরে একটি দুগ্ধ কারখানায় হামলায় চারজন মারা গেছেন। খেরসনে একটি পেট্রোল স্টেশনে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন।