‘বাংলায় আমাদের যত অত্যাচার করবেন, দিল্লিতে আপনাদের সমস্যা তত বাড়বে।’ গত ২৪ মে বিজেপিকে এভাবেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে ক্ষমতা হারানোর পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। তৃণমূলের কর্মীরা যখন নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার শিকার হচ্ছিলেন, তখন তিনি এ মন্তব্য করেন।

তবে গত দুই সপ্তাহে দিল্লি ও বাংলায় তৃণমূলের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত সপ্তাহে দলের ৮০ জন এমএলএর প্রায় ৫৮ জনের একটা বড় অংশ মমতার সিদ্ধান্ত অমান্য করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নিজেদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন করে। এরপর গত সোমবার লোকসভায়ও তৃণমূলের এমপিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।

তৃণমূলের প্রবীণ এমপি কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, দলের ২৮ জন লোকসভা এমপির মধ্যে ২০ জনই বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ জাতীয় স্তরে বিজেপিবিরোধী জোটের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি ছিল এই তৃণমূল কংগ্রেস।

তৃণমূলের এই বিদ্রোহের মূল তির দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা। বিদ্রোহীদের অভিযোগ, অভিষেক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের কারণে তৃণমূল জনগণের সমর্থন হারিয়েছে।

অন্যদিকে দলের অন্য অংশের দাবি, বিজেপি ভয় দেখিয়ে এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে দল ভাঙার এই চক্রান্ত করছে।

তবে দলটির এই পতনের পেছনে উভয় পক্ষই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এড়িয়ে যাচ্ছে। সেটি হলো, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোর চরম বিপর্যয়।

পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ

গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই দলের ভরাডুবির জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করতে শুরু করেন তৃণমূলের অনেক নেতা। তাঁদের অভিযোগ, দলে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আছেন, তাঁদের সরিয়ে আই-প্যাক নামের একটি রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অভিষেক।

এর আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া নেতারাও একই অভিযোগ করেছিলেন। ফলে নতুন করে দলত্যাগের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। এই বিতর্ক চরমে পৌঁছায় বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

আইন অনুযায়ী, তৃণমূলের নেতা নির্বাচনের অধিকার থাকলেও তারা ৮০ বছর বয়সী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে। কিন্তু বিজেপি-মনোনীত স্পিকার এতে দ্রুত সায় দেননি।

এরই মধ্যে তৃণমূলের দুজন এমএলএ দাবি করেন, শোভনদেবের মনোনয়ের চিঠিতে তাঁরা স্বাক্ষর করেননি। জালিয়াতির অভিযোগে বিজেপির নিয়ন্ত্রণাধীন রাজ্য পুলিশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে অভিযানও চালায়।


৩ জুন তৃণমূলের বিদ্রোহী এমএলএরা এক বৈঠকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বেছে নেন। এবার স্পিকার দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। এই নিয়োগের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল।

কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হলো, বিদ্রোহীরা কিন্তু এই সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তাঁদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাঁদের লড়াই মূলত মমতার ভাতিজা অভিষেকের বিরুদ্ধে।

পশ্চিমবঙ্গের এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সেখানে আদিত্য ঠাকরের বিরুদ্ধে গিয়ে একনাথ শিন্ডে শিবসেনা ভেঙে দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়েছিলেন মূলত মমতা কর্তৃক ‘ভাইপো’–কে গুরুত্ব দেওয়ার বিরোধিতায়।

অপারেশন ‘লোটাস’

তবে দলের অনুগত অংশটি পরিবারতন্ত্রের কারণে দল ভাঙার তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁরা একে বিজেপির ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন।

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূলের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই নেতারাই তো অভিষেককে যুবরাজ বানিয়েছিলেন, সেনাপতি বলতেন। তাহলে এখন কী পরিবর্তন হলো? আমরা ক্ষমতায় নেই বলেই কি এই রূপ?’

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান, দলত্যাগী তৃণমূল এমপিরা গত সোমবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদবের বাসভবনে বৈঠক করেছেন। সেখানে শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এটি স্পষ্টতই বিজেপির চক্রান্ত। ক্ষমতার লোভ বা ভয়েই নেতারা দল ছাড়ছেন।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ‘তাঁরা (তৃণমূলের বিদ্রোহীরা) মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়ানোতে এতই অভ্যস্ত হয়ে আছে, তাই এখনো সেটাই করে যাচ্ছেন।…তাঁরা ক্ষমতা ছাড়া বাঁচতে পারেন না। মাঠে নেমে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার ইচ্ছা তাঁদের নেই। এখন আমাদের বাকিদের কারাগারে ভরতে তাঁদের সাহায্য নেওয়া হবে।’

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একাধিক তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনার দিকে তিনি ইঙ্গিত করেন।

সাংগঠনিক বিপর্যয়

সব ক্ষেত্রে অবশ্য বিজেপিকে ভয় দেখাতে বা প্রলোভন দিতে হয়নি। যেমন সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানও বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন বলে খবর, যা তৃণমূল শিবিরে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

কৃষ্ণনগরের এমপি মহুয়া মৈত্র এক্স হ্যান্ডেলে ইউসুফ পাঠানকে ট্যাগ করে লিখেছেন, ‘অমিত শাহ ডাকলেই দিল্লিতে ছুটে যাবেন? কিছুটা তো আত্মসম্মান থাকা উচিত।’

গুজরাটের বাসিন্দা ইউসুফ পাঠান ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর আসন থেকে প্রথমবার এমপি হন। তিনি কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে পরাজিত করেছিলেন। তবে গত বছর ওই এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর নির্বাচনী এলাকায় না যাওয়ায় তিনি সমালোচিত হন।

কেবল পাঠানই নন, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সংসদে পাঠানোর কারণে তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত। পাশাপাশি নির্বাচনে হারার আগেও দলটি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের চেয়ে আই-প্যাক নামের রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

গত মাসে দলের পরাজয়ের পর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অনুগত নেতারাও আই-প্যাকের ওপর এই অতিনির্ভরতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন।

এই দুই কারণই মূলত তৃণমূলের দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোকে স্পষ্ট করে। আর ক্ষমতা হারানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দলটির এমন দ্রুত পতনের পেছনে এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় কারণ।

 প্রাইমটিভি/এমএইচ