অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করার সম্মতি আর তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্মতি এক বিষয় নয়। এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। সম্মতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলে এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে এফআইআর (প্রথম তথ্য বিবরণী) দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে কর্ণাটক পুলিশ। রাজ্যের সব আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে এই আদেশ মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে সেক্সটরশন বা ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি এবং ব্যক্তিগত ছবি ফাঁসের অভিযোগের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা স্থানীয় থানায় গিয়েও সঠিক বিচার পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ নিতে দেরি করেন বা সরাসরি খারিজ করে দেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন একটি ভুল ধারণা ছিল যে, ভুক্তভোগী যেহেতু শুরুতে নিজেই ছবি বা ভিডিও ধারণে সম্মতি দিয়েছিলেন, তাই পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অপরাধের উপাদান নেই। এই ভুল ধারণা ভাঙতেই রাজ্য পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে এই কড়া বার্তা দেওয়া হলো।

গত ১৫ জুনের এই আদেশে কর্ণাটকের ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (ডিজিপি) এম এ সালিম স্পষ্ট করে বলেছেন, ছবি বা ভিডিও ধারণের সম্মতি এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার সম্মতি সম্পূর্ণ আলাদা দুটি আইনি ধারণা। একজন ভুক্তভোগী নিজের ছবি বা ভিডিও ধারণে রাজি থাকলেও, তাঁ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে তা শেয়ার করা একটি আমলযোগ্য অপরাধ।

এই আদেশে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক ‘জাস্টিস কে এস পুত্তস্বামী বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলার রায়কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই রায়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার বা রাইট টু প্রাইভেসিকে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে শারীরিক গোপনীয়তা এবং নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের প্রচার নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।

ডিজিপি এম এ সালিম জানান, এই নিয়ম লঙ্ঘন করা ‘ভয়্যারিজম’ বা পরনিন্দা-পরপীড়নমূলক আচরণের শামিল। নতুন আইন অনুযায়ী ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর ৭৭ ধারা অনুসারে এই অপরাধের মামলা দায়ের করা যাবে। আদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো নারীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও তার সম্মতি ছাড়া ধারণ বা বিতরণ করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পুনরাবৃত্তির জন্য তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

বিএনএস-এর পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) আইনের ৬৬(ই), ৬৭ এবং ৬৭(এ) ধারাতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। আইটি আইন অনুযায়ী, সম্মতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত অঙ্গের ছবি ধারণ বা প্রকাশ করলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইটি আইনের এই নির্দিষ্ট ধারাগুলো কোনো লিঙ্গভিত্তিক নয়, অর্থাৎ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এই আইনের সুরক্ষা পাবেন।

ডিজিপি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি সম্মতিহীন অন্তরঙ্গ কনটেন্ট ফাঁসের ঘটনায় এফআইআর দায়ের করতে অস্বীকৃতি জানান বা দেরি করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারী ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নতুন এই নির্দেশনার ফলে এখন থেকে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ পাওয়ামাত্রই আইটি আইনের অধীনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সেই আপত্তিকর কনটেন্টগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ পাঠাতে বাধ্য থাকবেন। একই সঙ্গে অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ যাতে নষ্ট না হয়, তা দ্রুত সংরক্ষণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

 প্রাইমটিভি/এমএইচ