'রক্তাক্ত জুলাই থেকে গণঅভ্যুত্থান' ঐতিহাসিক পয়লা জুলাই আজ

‘জুলাই গণআন্দোলন’ । প্রাইম টিভি
আজ ঐতিহাসিক পয়লা জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনটি থেকেই এক নতুন গতি পেয়েছিল রক্তাক্ত ‘জুলাই গণআন্দোলন’। ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী চূড়ান্ত অভিযাত্রার মধ্য দিয়েই অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের। রক্তগঙ্গা পেরিয়ে সেই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর মাধ্যমে।
রক্তভেজা সেই গণআন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছেন শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, দিনমজুর থেকে শুরু করে নবজাতক শিশুসহ অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত সেই গৌরব আজ কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছেন বিপ্লবীরা?
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণজাগরণ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের নাম ‘জুলাই’। যার সূচনা হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালে আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মাঝে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ। মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেয়।
এর আগেও জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করেছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের অনাস্থা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি আর নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও ঘৃণা রাজপথে রূপ নেয় দাবানলে।

‘বাংলা ব্লকেড’ ও শেখ হাসিনার সেই মন্তব্য
কোটা সংস্কারের চার দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের লাগাতার কর্মসূচি। ২ থেকে ৬ জুলাই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দ্রোহের আগুন। আসে 'বাংলা ব্লকেড' এর মতো কঠোর কর্মসূচি। এই আন্দোলন দমাতে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগ ও পুলিশের পেটোয়া বাহিনী।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ১৪ জুলাই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি জমা দেয়। তবে সেই রাতেই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের তীব্র তাচ্ছিল্য করে বলেন: "মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতি-নাতনিরা কেউ মেধাবী না? যত রাজাকারের বাচ্চা, নাতি-নাতনি হলো মেধাবী? তাই না?"
প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেন।
আবু সাঈদের শাহাদাত ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’
১৬ জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আবু সাঈদ বুক পেতে পুলিশের গুলি বরণ করেন। সাঈদসহ পাঁচজনের শাহাদাতের পর আন্দোলন রূপ নেয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও সর্বাত্মক অবরোধে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। তবে এতে দমে না গিয়ে দেশে-বিদেশে সরকারবিরোধী জনমত আরও তীব্র হতে থাকে।

গুম, নির্যাতন ও ডিবি কার্যালয়ের নাটক
আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে গুম করে এবং পরে গুরুতর আহত অবস্থায় পূর্বাচলে ফেলে যায়। একদিকে চলে গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যা; অন্যদিকে সমন্বয়কদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালায় সরকারের প্রতিনিধি দল।
২২ জুলাই: ইন্টারনেট চালু ও কারফিউ প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেন নাহিদ ইসলাম।
২৬ ও ২৭ জুলাই: নাহিদ ইসলামসহ ৫ সমন্বয়ককে হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থান থেকে তুলে নিয়ে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়।
২৮ জুলাই: ডিবি কার্যালয়ে জোরপূর্বক সমন্বয়কদের মুখে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা ধারণ করে সংবাদ সম্মেলনের নাটক সাজানো হয়।
'মার্চ ফর জাস্টিস' থেকে এক দফা দাবি
ডিবি কার্যালয়ের নাটক সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করে। দেশজুড়ে শুরু হয় দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আঁকার মহোৎসব।
৩১ জুলাই: দেশজুড়ে পালিত হয় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’।
১ আগস্ট: তীব্র চাপের মুখে ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি পান ছয় সমন্বয়ক।
৩ আগস্ট: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো জনতার মহাসমাবেশ থেকে আসে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ ঘোষণা। শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।

৫ আগস্ট: ফ্যাসিবাদের পতন ও জনস্রোত
উত্তাল আগস্টে চারদিক থেকে আসতে থাকে লাশের খবর। পরিস্থিতি বিবেচনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট ঘোষণা করে।
৫ আগস্ট সকালে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে নামে লাখো মানুষের ঢল। কারফিউ ভেঙে গণভবন অভিমুখে ধেয়ে আসে জনস্রোত। সকল দাম্ভিকতার অবসান ঘটিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। চূর্ণ হয় ফ্যাসিবাদের মসনদ।
স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ
এত রক্ত, এত ত্যাগ আর অসংখ্য জীবনের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশের সাধারণ মানুষ, তা পূরণের পথে চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি আছে বিপুল সম্ভাবনাও। বিপ্লবের চেতনাকে বুকে ধারণ করে রাষ্ট্র সংস্কার, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনপ্রতিষ্ঠার এক নতুন যুদ্ধে নেমেছে দেশ। তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে যে অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়। দীর্ঘ দেড় দশকের জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব না হলেও, শহীদি আকাঙ্ক্ষার সেই সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। রক্তের দাগ মুছে যে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে, তা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারলেই সার্থক হবে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান।
প্রাইমটিভি/এনজি

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।








