ঢাকার গুলশান লেকপাড়ের যে জায়গায় একসময় ছিল হোলি আর্টিজান বেকারি, সেখানে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, ঠিক এক দশক আগে এই জায়গাটিই কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলায়।

আজ ১ জুলাই ২০২৬। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের সেই রক্তক্ষয়ী ও নৃশংস ঘটনার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর আর্তনাদ এবং শিক্ষিত-সচ্ছল পরিবারের তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ক্ষত আজও তাজা।

হোলি আর্টিজান হামলা

১ জুলাই ২০১৬: যেভাবে শুরু হয়েছিল সেই বিভীষিকা

২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। ইফতারের পর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্র, ককটেল ও ধারালো চাপাতি হাতে ভেতরে ঢুকে পড়ে পাঁচ তরুণ। শুরু হয় জিম্মি সংকট।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীদের বোমা ও গুলিতে গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। পরে তাঁরা মারা যান। এরপর র‍্যাব, সোয়াট, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। রাতভর গুলশানের রাস্তায় অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা।

হোলি আর্টিজান হামলা

‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ও ২০ জিম্মির লাশ

পরদিন ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে ঢোকেন। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু অভিযানের পর স্পষ্ট হয় ভেতরের নির্মমতা। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২০ জন জিম্মির লাশ। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জন।

যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন সেই রাতে

হোলি আর্টিজানের নিষ্ঠুরতা ছিল পরিকল্পিত। জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত হয়ে বেছে বেছে বিদেশিদের হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন:

বাংলাদেশিঃ ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির এবং ইশরাত আখন্দ (৩ জন)

ভারতীয়ঃ তারিশি জৈন (১ জন)

ইতালীয়ঃ ক্লাউদিয়া কাপেল্লি, ভিনচেনসো দালেস্ত্রো, মার্কো তোন্দাৎ, নাদিয়া বেনেদিত্তি, সিমোনা মন্তি, ক্রিস্তিয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি, আদেলে... প্রমুখ (৯ জন)

জাপানিঃ ওকামুরা মাকাতো, কোয়ো ওগাসাওয়ারা, হাসিমাতো হিদেকো, তানাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, শিমুধুইরা রুই ও কুরুসাকি নুবুহিরি (৭ জন)

তাঁদের এই আকস্মিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।

হোলি আর্টিজান হামলা

নব্য জেএমবি ও আইএসের দায় স্বীকার

হামলা চলাকালেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ঘটনার দায় স্বীকার করে তাদের বার্তা সংস্থা 'আমাক'-এ ছবি প্রকাশ করে। তবে তৎকালীন সরকারের ভাষ্য ছিল এটি দেশীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ‘নব্য জেএমবি’র কাজ, যারা মূলত আইএস মতাদর্শী ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, হামলাকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কূটনৈতিক এলাকায় নৃশংসতা চালিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা জাহির করা।

সচ্ছল পরিবারের সন্তান ও ‘হিজরতের’ নামে নিখোঁজ

হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের সমাজকে এক নতুন ও ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। হামলাকারী পাঁচ তরুণের তিনজনই ছিলেন ঢাকার নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, স্কলাসটিকা, নর্থ সাউথ ও মোনাশ ইউনিভার্সিটি) এবং সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তারা হলেন:

১. রোহান ইবনে ইমতিয়াজ (আক্রমণকারী দলের নেতা)

২. নিবরাস ইসলাম

৩. মীর সামেহ মোবাশ্বের

৪. খায়রুল ইসলাম পায়েল

৫. শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল

এসব তরুণ ঘটনার বেশ কয়েক মাস আগে ‘হিজরতের’ নামে ঘর ছেড়েছিলেন। ঘর ছাড়ার পর তাঁদের ঝিনাইদহ, বগুড়াসহ বিভিন্ন আস্তানায় রেখে হত্যার দীক্ষা দেওয়া হয় এবং গাইবান্ধার চরে অস্ত্র ও বোমার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

prothomalo-bangla_2026-06-30_f6tslsbh_holey_artisan_attack_graphics_3

আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়া

হামলার পর দেশজুড়ে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হন এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়ক তামিম আহমেদ চৌধুরী। এরপর আজিমপুর, রূপনগরসহ বিভিন্ন আস্তানায় অভিযানে নিহত এবং গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির শীর্ষ সংগঠকরা।

মামলার রায়

দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৮ আসামির মধ্যে ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট সেই সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন।

হোলি আর্টিজান হামলা

এক দশক পরও সতর্কবার্তা

গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই মাত্রার আর কোনো বড় হামলা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দাবি করলেও সমাজবিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সতর্কতার জায়গাটি এখনও রয়ে গেছে।

সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হয়তো অভিযানে দমন করা সম্ভব, কিন্তু অনলাইন র‍্যাডিক্যালাইজেশন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও উগ্র মতাদর্শের গোড়া উপড়ে ফেলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাজ। তাই ১০ বছর পর গুলশানের সেই লেকপাড়ের শান্ত বহুতল ভবনটি আমাদের শুধু শোকের স্মৃতি মনে করায় না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা দিয়ে যায়।

প্রাইমটিভি/এনজি