রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। চরম গরমে প্রাণহানি বাড়ছে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, বন্ধ রাখতে হচ্ছে স্কুল-কলেজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। একই সঙ্গে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক বড় শহর নজিরবিহীন ‘হিট স্ট্রেস’-এর ঝুঁকিতে পড়েছে।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) জানায়, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই চলমান তাপপ্রবাহ এত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সংস্থাটির গবেষণায় বলা হয়েছে, ৫০ বছর আগে জুন মাসে এমন তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় ছিল না বললেই চলে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৬ সালের তুলনায় বর্তমানের একই ধরনের তাপপ্রবাহে দিনের তাপমাত্রা প্রায় ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের তুলনায়ও এখনকার পরিস্থিতি আরও তীব্র।

গবেষণার প্রধান লেখক, লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের থিওডোর কিপিং বলেন, শিল্পবিপ্লবের পর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর ফলে চরম তাপপ্রবাহ এখন অনেক বেশি ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিচ্ছে।

ডব্লিউডব্লিউএর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, আবহাওয়ার ধরনটি স্বাভাবিক হলেও বর্তমানের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক এবং এর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই প্রধান কারণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সমন্বয়ে তৈরি হওয়া ‘হিট স্ট্রেস’ মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে অঙ্গ বিকল হওয়া থেকে মৃত্যুও ঘটতে পারে।

গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ইউরোপের প্রায় ৮৫০টি শহরের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশে জুন মাসে সর্বোচ্চ হিট স্ট্রেসের রেকর্ড ভেঙেছে অথবা ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ফ্রান্সে তাপপ্রবাহের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। রাজধানী প্যারিসে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রকাশ্যে মদ্যপান ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অ্যালকোহল বিক্রি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।

প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে জুন মাসের নতুন রেকর্ড গড়েছে। তাপপ্রবাহ শুরুর পর থেকে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে গাড়ির ভেতরে তিন শিশুরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

চরম গরমের কারণে বহু স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, পার্ক ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হচ্ছে এবং আইফেল টাওয়ার ও ল্যুভর মিউজিয়ামের দর্শন সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

ডব্লিউডব্লিউএ বলছে, ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ও এর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।

প্রাইমটিভি/এমএইচ