মহাবিশ্ব। অসীম বিস্তারের এক অজানা জগৎ। যেখানে কোটি কোটি গ্যালাক্সি, অসংখ্য নক্ষত্র আর অদেখা রহস্য ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আর এই বিশালতার মাঝেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে রহস্যময় এক সত্তা ব্ল্যাক হোল।

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর এমন এক মহাজাগতিক বস্তু, যার মহাকর্ষীয় টান এতটাই প্রবল যে এর কাছ থেকে আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না। তাই একে সরাসরি দেখা যায় না। এটি আলো শোষণ করে, প্রতিফলিত করে না। ফলে মহাশূন্যে এটি যেন এক অদৃশ্য অন্ধকার অঞ্চল। তবে ব্ল্যাক হোল কোনো ফাঁকা গর্ত নয়। এটি আসলে অত্যন্ত ঘন পদার্থের এক ক্ষুদ্র, কিন্তু ভয়ংকর শক্তিশালী অবস্থা। ভাবুন, সূর্যের সমান ভর যদি কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে সংকুচিত হয় তখনই তৈরি হবে একটি ব্ল্যাক হোল। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা আছে, যাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন। এই সীমা পেরিয়ে গেলে আর ফেরার কোনো পথ নেই। যেন একমুখী দরজা, প্রবেশ আছে কিন্তু প্রস্থান নেই।

ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয় মূলত বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে। যখন একটি বৃহৎ তারা নিজের ভর সামলাতে না পেরে ভেঙে পড়ে, তখন ঘটে সুপারনোভা বিস্ফোরণ। এরপর তার কেন্দ্র দ্রুত সংকুচিত হতে হতে এমন এক বিন্দুতে পৌঁছায়, যেখানে আমাদের পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভেঙে যায়। এই অবস্থাকেই বলা হয় সিঙ্গুলারিটি আর এর চারপাশেই গড়ে ওঠে ব্ল্যাক হোল। একসময় ব্ল্যাক হোল ছিল কেবল তত্ত্ব। আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বে এর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদিও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান ছিলেন। পরে রজার পেনরোজ প্রমাণ করেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্ল্যাক হোল তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। এরপর শুরু হয় পর্যবেক্ষণের যুগ। বিজ্ঞানীরা সরাসরি ব্ল্যাক হোল দেখতে না পারলেও এর আশপাশের আচরণ বিশ্লেষণ করে এর উপস্থিতি শনাক্ত করেন। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে তৈরি হয় উত্তপ্ত গ্যাস ও ধূলিকণার ঘূর্ণায়মান চক্র এক্রেশন ডিস্ক যা প্রচুর আলো ও এক্স-রে বিকিরণ করে।

২০১৯ সালে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি ব্ল্যাক হোলের ছবি ধারণ করা সম্ভব হয় ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ প্রকল্পের মাধ্যমে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপিত টেলিস্কোপের তথ্য একত্র করে তৈরি হয় সেই ঐতিহাসিক ছবি। তবে একটি ভুল ধারণা এখনো প্রচলিত, ব্ল্যাক হোল সবকিছু টেনে নেয়। বাস্তবে তা নয়। দূর থেকে এটি অন্য যেকোনো ভরযুক্ত বস্তুর মতোই আচরণ করে। কিন্তু খুব কাছে চলে গেলে শুরু হয় ভয়াবহ এক প্রক্রিয়া স্প্যাগেটিফিকেশন। যেখানে বস্তু মহাকর্ষের চাপে লম্বা হয়ে ছিঁড়ে যায়। আরও বিস্ময়কর হলো, ব্ল্যাক হোল কখনো কখনো শক্তিশালী জেট স্ট্রিম তৈরি করে, যা আলোর গতির কাছাকাছি বেগে মহাশূন্যে ছুটে চলে। এমনকি একটি তারা গ্রাস করার বহু বছর পরও এই জেট সক্রিয় থাকতে পারে যা এখনো বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় রহস্য। এছাড়া, যখন দুটি ব্ল্যাক হোল একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন সৃষ্টি হয় গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, যা মহাশূন্য কাঁপিয়ে পৃথিবীতেও শনাক্ত করা যায়।

সবশেষে প্রশ্ন, ব্ল্যাক হোল কি শুধু ধ্বংসের প্রতীক? উত্তরঃ না। বরং অনেক গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যা পুরো গ্যালাক্সির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, ধ্বংসের পাশাপাশি এটি মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অজানা রহস্য, অসীম শক্তি আর বিস্ময়কর বিজ্ঞান সব মিলিয়ে ব্ল্যাক হোল এখনো এক অনন্য ধাঁধা। আর এই অন্ধকারের গভীরেই হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় উত্তর।