বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কিংবা ‘লা লা লা’ গানের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসেন বিশ্বখ্যাত ল্যাটিন পপ তারকা শাকিরা। তবে অনেকেরই অজানা, প্রায় দুই দশক আগে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নীরবে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন তিনি।

২০০৭ সালের নভেম্বরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর ইউনিসেফের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। ১৬ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় পৌঁছেই তিনি রাজধানীতে দীর্ঘ সময় না থেকে ছুটে যান দুর্যোগকবলিত উপকূলীয় অঞ্চলে।

সফরের দ্বিতীয় দিনে পটুয়াখালীর সিডর-আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এই সংগীতশিল্পী। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, নারী ও শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দুর্যোগের ভয়াবহতা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন।

সফরের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ১১ বছর বয়সী নিপা নামের এক শিশুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। সিডরে মা-বাবাকে হারানো ওই শিশুর কণ্ঠে একটি শোকের গান শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শাকিরা। পরে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, গানটির অর্থ ছিল ‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।’ সেই মুহূর্ত তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করেন।

দুর্যোগের চিত্র দেখে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন শাকিরা। তিনি বলেন, পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, মানুষের সবকিছু হারিয়ে ফেলা এবং সন্তানহারা মায়েদের কান্না তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের হাসিমুখ, খেলাধুলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আশাবাদ তাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।

বাংলাদেশ সফরে তিনি রাজশাহীতেও ইউনিসেফের একটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

শিশুদের কল্যাণে কাজ করার ক্ষেত্রে শাকিরার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি নিজের দাতব্য সংস্থা পিয়েস দেসকালসোস (Pies Descalzos Foundation) প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ দেশের দরিদ্র শিশুদের জীবনসংগ্রাম থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইউনিসেফের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাকিরার বাংলাদেশ সফরটি ছিল অত্যন্ত প্রচারবিমুখ। শিল্পীর ব্যক্তিগত আগ্রহেই সফরটি সীমিত পরিসরে রাখা হয়েছিল। প্রচারণার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা এবং শিশুদের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখতেই তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন।

সফর শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শাকিরা বলেছিলেন, বাংলাদেশের শিশু ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আরও বেশি বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বিশ্বকাপের সময় যখন শাকিরার গান বিশ্বজুড়ে নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়, তখন বাংলাদেশের জন্য তার এই মানবিক সফরের স্মৃতি অনেকের কাছেই রয়ে গেছে আড়ালে। অথচ প্রায় দুই দশক আগে দুর্যোগপীড়িত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি রেখে গিয়েছিলেন সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

প্রাইমটিভি/এমএইচ