ইউরোপজুড়ে চলমান ভয়াবহ তাপপ্রবাহে গত এক সপ্তাহে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রান্সে মাত্র তিন দিনের তীব্র গরমেই প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুনের পর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি জার্মানিতে রেকর্ড তাপমাত্রা, গ্রিসে ভয়াবহ দাবানল, সুইডেনে বজ্রপাত এবং ডেনমার্কে তীব্র ঝড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস জানিয়েছেন, বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করছেন। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় মহাদেশটি দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে, ফলে একসময় বিরল বলে বিবেচিত তাপপ্রবাহ এখন প্রায় প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ইউরোপে শত শত মানুষের মৃত্যু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ—সবই জলবায়ু সংকটের বাস্তব চিত্র। তাপজনিত শারীরিক চাপকে তিনি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের সবচেয়ে গরম তিন দিনে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ওই সময়ে অন্তত এক হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছরের বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি থাকা অঞ্চলগুলোতে।

জার্মানিতেও ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির কিছু এলাকায় দিনের তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত গরমে বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক ও রেল অবকাঠামো। শুধু বার্লিনেই একদিনে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স কল রেকর্ড করা হয়েছে।

চরম গরমে জার্মানির কয়েকটি মহাসড়কের কংক্রিটের অংশ ফেটে গেছে এবং রেললাইনের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ট্রেন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে। হামবুর্গ থেকে প্রাগগামী একটি ট্রেনে বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যাওয়ায় ৬০০-এর বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করতে হয়।

এদিকে তাপপ্রবাহের পর ইউরোপের কয়েকটি দেশে বৈরী আবহাওয়াও দেখা দিয়েছে। সুইডেনে বজ্রপাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন, ডেনমার্কে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী বজ্রঝড়। অন্যদিকে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় গ্রিসের পাঁচটি অঞ্চলে দাবানলের সর্বোচ্চ ঝুঁকির সতর্কতা জারি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এবারের তাপপ্রবাহ এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তাদের মতে, কয়েক দশক আগেও এমন তাপপ্রবাহ কল্পনা করা যেত না, অথচ বর্তমানে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় বহু গুণ বেশি ঘন ঘন ঘটছে।

প্রাইমটিভি/এমএইচ