ট্রাম্প কি রাজনীতিবিদ? নাকি বিশ্ব রাজনীতির জুয়াড়ি

বিশ্ব রাজনীতির জুয়াড়ি ট্রাম্প । সংগৃহীত
ট্রাম্পের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটা যেন এক বিশাল গ্লোবাল ক্যাসিনো, যেখানে ডনাল্ড ট্রাম্প হলেন এক দুর্ধর্ষ জুয়াড়ি। যিনি গেমের নিয়ম মানার চেয়ে ক্যাসিনোর টেবিল উল্টে দিতেই বেশি পছন্দ করেন। তার কাছে গোটা বিশ্বটাই একটা বিশাল ‘ব্যালেন্স শিট’। যেখানে আদর্শ বা আবেগের কোনো জায়গা নেই, আছে শুধু লাভ আর ক্ষতির নিখাদ হিসাব।
ট্রাম্পের কাছে কোনো দেশই চিরস্থায়ী বন্ধু নয়, বরং একেকটা ‘বিজনেস ডিল’। তার কূটনীতি অনেকটা ‘আনপ্রেডিক্টেবল ঝড়ের’ মতো। যাকে ভরসা করে ঘর থেকে বের হওয়া যায়, কিন্তু মাঝপথে ছাতা কেড়ে নিতে তার এক মুহূর্তও দ্বিধা হয় না।
একদিকে তিনি চীনের বিরুদ্ধে তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেন, অন্যদিকে আবার বেইজিং সফরে গিয়ে হাসিমুখে হাত মেলান শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংসের হুমকি দিয়েই পরক্ষণে কিম জং উনের সাথে তোলেন সেলফি। ইউক্রেনকে সমর্থনের বুলি আউড়েও পরে কমিয়ে দেন সহায়তা, এমনকি দেশটির বিরল খনিজ সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ মালিকানা চেয়ে বসেন। আবার সৌদি আরবের সঙ্গে শত বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করলেও ন্যাটো মিত্রদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন ‘নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা সামলান’ ।
তাহলে প্রশ্ন উঠেই যায়, ট্রাম্প আসলে কার বন্ধু? আর ট্রাম্পেরই বা বন্ধু কে? তিনি কি আদর্শ দিয়ে রাজনীতি করেন, নাকি শুধুই স্বার্থ দিয়ে?

ট্রাম্পের রাজনীতির মূল সূত্র: বিশ্ব যখন ব্যবসার টেবিল
ট্রাম্প যখন ওভাল অফিসে বসেন, তখন তিনি নিজেকে একজন ‘প্রেসিডেন্ট’ নয়, বরং একজন ঝানু ‘ডিল মেকার’ হিসেবে দেখেন। তার দৃষ্টিতে প্রতিটি দেশ হলো একেকটি ভেন্ডর বা সাপ্লায়ার, আর বিশ্ব রাজনীতি হলো একটি বিশালাকার করপোরেট ডিল। ট্রাম্পের পুরো বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিই মন্ত্র: ‘আমেরিকার লাভ সবার আগে’।
তার দর্শনের মূল কথা হলো ‘আমি তোমাকে রক্ষা করব ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে?’ অর্থাৎ, ট্রাম্পের দরবারে বন্ধু বা শত্রু হওয়াটা কোনো আদর্শিক বিষয় নয়; বরং তা নির্ভর করে সেই মুহূর্তে আমেরিকার অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, ব্যবসা কিংবা কৌশলগত লাভ ক্ষতির ওপর।
এ কারণেই তার রাজনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ বলে কিছু নেই, আছে শুধু ‘স্থায়ী স্বার্থ’। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো পুরনো মিত্র দেশগুলো যখন আমেরিকার সামরিক সুরক্ষা চায়, ট্রাম্প তখন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বদলে সরাসরি খরচের বিল পাঠিয়ে দেন। টাকা না দিলে বা আমেরিকার পকেট ভারী না হলে তিনি ‘বন্ধুত্ব’ নামক ফাইলটি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবেন না। এই লেনদেনমুখী কূটনীতি ই ট্রাম্পকে বিশ্বমঞ্চে একজন চরম অনিশ্চিত কিন্তু দুর্ধর্ষ জুয়াড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলা
চীনের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্কটা কোনো সরলরেখা নয়, বরং পুরোদস্তুর জিগজ্যাগ লাইনের মতো। তিনি চীনকে ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ বা চোর বলে গালি দিতেও ছাড়েন না, আবার দরকারে সেই চীনের সঙ্গেই আলোচনার টেবিলে বসেন। ২০১৮ সালে যখন ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শত শত বিলিয়ন ডলারের শুল্ক বসালেন, তখন তার মূল অভিযোগ ছিল ৩টি:
• চীন আমেরিকার মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে।
• মার্কিন প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্ব চুরি করছে।
• আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অন্যায্য সুবিধা নিচ্ছে।
এই পদক্ষেপ থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ। কিন্তু সম্পর্ক যদি এতই খারাপ হয়, তবে ট্রাম্প আবার বেইজিংয়ের সাথে দর-কষাকষিতে যান কেন? এর পেছনে রয়েছে কিছু রূঢ় বাস্তববাদী কারণ:
• আমেরিকার বড় বড় কোম্পানি এখনও চীনের বিশাল বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
• বিশ্ব অর্থনীতি থেকে চীনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
• ট্রাম্পের মূল কৌশল হলো সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং চাপ সৃষ্টি করে নিজের শর্তে দরকষাকষি করা।
তাই তিনি একদিকে চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ান, আবার অন্যদিকে আলোচনার পথও খোলা রাখেন। এমনকি যখনই শি জিনপিং কোনো বড় বাণিজ্যিক সমঝোতার ইঙ্গিত দেন, তখন ট্রাম্পের ভাষাও হঠাৎ নরম হয়ে যায় এবং তিনি চীনা প্রেসিডেন্টকে “অসাধারণ বন্ধু” বলতেও দ্বিধা করেন না। এটাই ট্রাম্পের বিখ্যাত স্টাইল: আগে চাপ সৃষ্টি করো, তারপর সেই চাপকে ব্যবহার করে নিজের জন্য সেরা চুক্তি আদায় করো।
পরিত্যক্ত মিত্র: ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ কূটনীতি
ট্রাম্পের ইতিহাসের সব থেকে বড় সমালোচনার জায়গা হলো বিপদের সময় মিত্রদের একা ফেলে আসা। একে বলা যায় ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ কূটনীতি। সিরিয়ার কুর্দিরা আইএসের বিরুদ্ধে আমেরিকার হয়ে রক্ত দিল, কিন্তু যখনই ট্রাম্পের মনে হলো ওখানে সৈন্য রাখাটা ‘ব্যয়বহুল’, তিনি এক নিমিষেই সৈন্য সরিয়ে নিলেন। মিত্রদের ওপর হামলা হতে দেখেও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

আফগানিস্তান: মিত্রের বদলে শত্রুর সাথে হাত মেলানো
ট্রাম্পের কাছে আফগানিস্তান ছিল আমেরিকার ইতিহাসের এক বিশাল ‘লোকসানি প্রজেক্ট’। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পরিষ্কার—‘যে যুদ্ধে কোনো আর্থিক বা কৌশলগত লাভ নেই, সেখানে এক ডলার খরচ করাও বোকামি’।
তাই দীর্ঘদিনের মিত্র আশরাফ গনি সরকারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তিনি সরাসরি প্রধান শত্রু তালেবানদের সাথেই আলোচনায় বসেন, যা ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিরল। ট্রাম্প বুঝেছিলেন, এই যুদ্ধ শেষ করে সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হলে যারা মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী, তাদের সাথেই ডিল করতে হবে। এখানে নৈতিকতার চেয়ে তার কাছে ‘এক্সিট রুট’ বা বের হওয়ার পথটি বেশি জরুরি ছিল।
দোহা চুক্তির মাধ্যমে তিনি তালেবানদের সাথে সমঝোতায় আসেন। এতে আফগান সরকারের ভবিষ্যৎ কী হবে বা সাধারণ মানুষের কী দশা হবে, তা এক মুহূর্ত না ভেবে, যেকোনো মূল্যে খরচ কমাতে পুরনো মিত্রকে ত্যাগ করে সরাসরি প্রধান প্রতিপক্ষের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন ট্রাম্প। একেই বলা হয় চরম প্র্যাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী রাজনীতি।
ন্যাটো জোট: ‘নিজেদের খরচ নিজে দাও’
ন্যাটো এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কড়া ‘হিসাবরক্ষক’ এর মতো। তিনি মনে করেন, ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল এবং তারা তাদের পর্যাপ্ত বাজেট প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করছে না। তাই ট্রাম্পের স্পষ্ট প্রশ্ন ছিল “আমেরিকা কেন সবার যুদ্ধের খরচ একাই বহন করবে?”
তার এই অনমনীয় অবস্থানে ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো দেশগুলো চরম উদ্বেগে পড়ে যায়। এমনকি ট্রাম্প ন্যাটো থেকে আমেরিকাকে বের করে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন, যা কয়েক দশকের ট্রান্স-আটলান্টিক বন্ধুত্বকে নাড়িয়ে দেয়। মূলত, ট্রাম্পের কাছে আন্তর্জাতিক জোটে থাকার চেয়ে আর্থিক সমবন্টন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রথমবারের মতো আমেরিকার ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে নিজেদের আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি ও গ্রিনল্যান্ড মিশন
১. মধ্যপ্রাচ্য নীতি: ‘অস্ত্র বেচো, তেল সামলাও, ইরান ঠেকাও’
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নীতি চরম আদর্শহীন কিন্তু প্রবলভাবে স্বার্থকেন্দ্রিক ও ব্যবসায়িক। সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের ধনী দেশগুলোর সাথে তার ঘনিষ্ঠতার কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই, বরং ৩টি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে:
• কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র চুক্তি করা।
• বিশ্ব তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা।
• ইরানকে একঘরে করার আঞ্চলিক কৌশল।
২. গ্রিনল্যান্ড মিশন: ‘লোকেশন ভালো, কিনে ফেলি’।
ট্রাম্পের ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম অদ্ভুত ঘটনা। একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর মতো তিনি গ্রিনল্যান্ডকে মানচিত্রের ভূখণ্ড হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের ‘কৌশলগত প্রপার্টি’ হিসেবে দেখেছিলেন। এর পেছনে কারণ ছিল:
• আর্কটিক অঞ্চলের সামরিক গুরুত্ব।
• বিপুল খনিজ সম্পদ।
• চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানো।
ডেনমার্ক যখন এই প্রস্তাবকে ‘উদ্ভট’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, তখন ট্রাম্প অপমানিত বোধ করেন এবং তার নির্ধারিত ডেনমার্ক সফর বাতিল করে দেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের কাছে ভূ-রাজনীতি মানেই বিশাল কোনো প্রপার্টি কেনাবেচার চুক্তি।
কূটনীতির গিরগিটি রূপ: লাভ-ক্ষতির পাল্লায় সমর্থক ও সমালোচক
ট্রাম্পকে বুঝতে গেলে একটা বিষয় পরিষ্কার রাখতে হবে। তিনি প্রচলিত কোনো কূটনীতিক নন। তিনি একজন পিওর ব্যবসায়ীর লেন্স দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিকে দেখেন। তাই আজকের প্রতিপক্ষ কালকের আলোচনার সঙ্গী হতে পারে, আবার আজকের পরম বন্ধুও কাল চাপের মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত উক্তিটি হলো: “তিনি আবেগ দিয়ে বন্ধুত্ব করেন না, তিনি লাভ-লোকসান দেখে সম্পর্ক চালান।”

সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি, সমালোচকদের অভিযোগ
• তিনি সবসময় আমেরিকার স্বার্থ আগে দেখেন।
• তিনি নির্ভরযোগ্য মিত্রদেরও চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেন।
• অকারণ যুদ্ধ জড়িয়ে মার্কিন অর্থ নষ্ট করতে চান না।
• হঠাৎ ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
• মার্কিন ট্যাক্সপেয়ারদের টাকা বাঁচাতে সচেষ্ট।
• বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেন।
• পুরোনো ও অকার্যকর কূটনৈতিক নিয়ম ভাঙতে পারেন।
• আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছেন।
ডনাল্ড ট্রাম্প রাজনীতিবিদ নাকি জুয়াড়ি এই বিতর্কের শেষ নেই। তবে এটা নিশ্চিত যে, তার এই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ ও ‘ডিল-মেকিং’ কূটনীতি বিশ্ব রাজনীতির চেনা সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি এমন এক খেলোয়াড়, যিনি তাস উল্টে দিয়েও শেষ হাসি হাসতে জানেন।
প্রাইমটিভি/এনজি

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









