অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বছরে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা: টিআইবি

ছবি- সংগৃহীত
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বছরে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি সেবা খাতে প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাঠামো অনুসরণ করে দেশের আট বিভাগের শহর ও গ্রামের ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে ১৮টি সুনির্দিষ্ট সেবা খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মতো এবারও পাসপোর্ট সেবা খাতেই দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ পাসপোর্টসেবা গ্রহণকারী ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), যেখানে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কৃষি, ভূমি এবং বিচার বিভাগীয় সেবাখাতে তুলনামূলকভাবে বেশি ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব খাতে প্রতি পরিবারের গড় ঘুষের পরিমাণও বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে প্রতি পরিবার গড়ে ৫ হাজার ১২৪ টাকা ঘুষ দিয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম।
তবে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষের সংস্কৃতি এখনো বহাল রয়েছে বলে মনে করেন অধিকাংশ মানুষ। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া এখনও কঠিন।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগে দুর্নীতিকে ন্যায়বিচার পাওয়ার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন উত্তরদাতারা। এছাড়া কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ সেবায় দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে বা আরও বেড়েছে বলেও মত দিয়েছেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের অধিকাংশের ধারণা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে অভিযোগ করে কোনো লাভ হয় না। প্রায় অর্ধেক পরিবারই জানে না কোথায় বা কীভাবে দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে জানলেও মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে অবগত ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ঘুষ প্রদানের হার শহরের তুলনায় বেশি। গ্রামে ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে, যেখানে শহরে এ হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে শহুরে পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশি অঙ্কের ঘুষ দিয়েছে।
টিআইবি আরও জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় বেশি হারে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সরকারি সেবা পেতে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় দুর্নীতি কমেনি। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতারা এখনও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল থাকায় ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
টিআইবির মতে, সরকারি সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।
প্রাইমটিভি/কেআর

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।





