কলম্বিয়ায় যেভাবে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছেন মুসলিমরা

ছবিঃ সংগৃহীত
একসময় অর্থনৈতিক মন্দা, সীমান্তে কড়াকড়ি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে কলম্বিয়ায় আরব সম্প্রদায়ের ব্যবসায়িক আধিপত্য ভেঙে পড়েছিল। তবে দীর্ঘ সময়ের সেই সংকট পেছনে ফেলে এখন আবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশটির মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠী। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতাও বাড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজধানী বোগোতাসহ বিভিন্ন শহরে নতুন নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
পশ্চিম বোগোতার একটি সাধারণ আবাসিক ভবনের ওপরের তলায় অবস্থিত ‘আল-কুরতুবি সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজ’ বর্তমানে একটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জুমার দিনে ছোট্ট এ মসজিদে স্থানীয় ও প্রবাসী মুসল্লিদের উপস্থিতিতে জায়গা সংকুলান হয় না। তরুণ ইমাম আহমদ জিয়ান জিমেনেজ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে জুমার খুতবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করেন।
২২ বছর বয়সী এ ইমামের মতে, কয়েক বছর আগেও কলম্বিয়ার অধিকাংশ মুসলিম ছিলেন অভিবাসী। কিন্তু বর্তমানে মুসলিমদের বড় অংশই স্থানীয় কলম্বিয়ান, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
পরিসংখ্যানও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০০৭ সালে রাজধানী বোগোতায় মাত্র একটি মসজিদ থাকলেও বর্তমানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছয়টি মসজিদ গড়ে উঠেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কলম্বিয়ায় আরবদের আগমন শুরু হয় উনিশ শতকের শেষদিকে, অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময়। উন্নত জীবনের আশায় বর্তমান লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ লাতিন আমেরিকায় পাড়ি জমান। তাদের একটি অংশ কলম্বিয়ায় বসতি স্থাপন করে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের ব্যারানকুইলা ও সীমান্ত শহর মাইকাওতে।
পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় দ্বিতীয় দফায় বিপুলসংখ্যক লেবানিজ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন। তাদের হাত ধরেই মাইকাও শহরটি আরব ব্যবসায়ীদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কাপড়, সুগন্ধি, ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায় তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
এই সমৃদ্ধির সময়েই ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় ‘ওমর ইবনে খাত্তাব’ মসজিদ, যা লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দারুল আরকাম’ স্কুল, যেখানে আরবি ভাষা ও ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। এমনকি ২০২০ সালে লেবানিজ-কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত মোহামাদ জাফর দাসুকি দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন।
তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, অর্থপাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়ে যায়। একই সময়ে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট, সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানিতে সরকারি বিধিনিষেধের কারণে মাইকাওর ব্যবসায়িক পরিবেশ ভেঙে পড়ে।
ফলে বহু আরব পরিবার কলম্বিয়ার অন্যান্য শহর, পানামা কিংবা নিজ দেশ লেবাননে ফিরে যায়। একসময় হাজারো শিক্ষার্থীতে ভরা দারুল আরকাম স্কুলে এখন শিক্ষার্থী নেমে এসেছে মাত্র দেড় শতাধিকের কাছাকাছি। মাইকাওতেও আরব বাসিন্দার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তবু আশার আলো দেখছেন স্থানীয় মুসলিম নেতারা। তাদের বিশ্বাস, ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ফিরে আসছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের পরিধিও বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয়দের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা ভবিষ্যতে কলম্বিয়ার মুসলিম সমাজকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করছেন তারা।
প্রাইমটিভি/এমএইচ

ডেস্ক রিপোর্ট
© 2026 প্রাইম টেলিভিশন, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









