কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরে মৃত অবস্থায় পাওয়া একটি গাঙ্গেয় শুশুককে বড় মাছ মনে করে কেটে অন্তত এক শ মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, প্রাণীটি কী তা বুঝতে না পেরেই তারা এ কাজ করেছেন। ভাগ পাওয়া মাংসের কিছু অংশ রান্না করে খেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার সকালে অষ্টগ্রামের ইকুরদিয়া ঘাটের কাছে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পশ্চিম অষ্টগ্রামের রংপুরহাটি গ্রামের কয়েকজন জেলে বৃহস্পতিবার রাতে হাওরে মাছ ধরতে যান। ভোরে মাছ বিক্রি করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর বাজারে যাওয়ার পর ফেরার পথে শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ইকুরদিয়া ঘাটের কাছে পানির নিচে অস্বাভাবিক বড় একটি প্রাণী দেখতে পান তারা।

প্রথমে প্রাণীটিকে বড় কোনো মাছ বলে মনে করেছিলেন জেলেরা। পরে নৌকা থামিয়ে পর্যবেক্ষণ করে সেটি মৃত বলে নিশ্চিত হন। কয়েকজন জেলে পানিতে নেমে রশি দিয়ে বেঁধে প্রাণীটিকে তীরে নিয়ে আসেন।

ডলফিন ধরা পড়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে। পরে ওজন করে দেখা যায়, প্রাণীটির ওজন প্রায় আড়াই মণ।

তবে প্রাণীটি আসলে কী, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার আগেই সেটি কেটে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জেলেরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাটার কাজ শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কাটার পর দুপুরের দিকে অন্তত এক শ মানুষের মধ্যে মাংস ভাগ করে দেওয়া হয়।

জেলে নোয়াব মিয়া জানান, দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মাছ ধরলেও হাওরে এমন প্রাণী আগে কখনো দেখেননি তিনি। ফলে প্রাণীটি পাওয়ার পর কী করা উচিত কিংবা কোন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, সে বিষয়েও তাদের ধারণা ছিল না।

আরেক জেলে জুনায়েদ মিয়া বলেন, মাছ মনে করেই অনেকে মাংস ভাগ করে নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ তা রান্না করেও খেয়েছেন।

প্রাণীটি কেটে ফেলার আগে তোলা কয়েকটি ছবি দেখে বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু এটি গাঙ্গেয় শুশুক বলে শনাক্ত করেছেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম প্লাটানিস্তা গ্যাঞ্জেটিকা।

কিশোরগঞ্জের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামও ছবি দেখে বলেন, প্রাণীটি গাঙ্গেয় শুশুক বলেই মনে হচ্ছে। তিনি জানান, এটি কোনো মাছ নয়; এটি একটি জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী।

তার ভাষ্য, দূষণসহ বিভিন্ন কারণে গাঙ্গেয় শুশুক স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে উজানের দিকে চলে আসতে পারে। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা কিংবা নৌযানের যন্ত্রের আঘাতেও এ ধরনের প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু প্রাণীটি কেটে ফেলার কারণে এখন মৃত্যুর কারণ কিংবা প্রজাতি শনাক্তের বিষয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গাঙ্গেয় শুশুক একটি মহাবিপন্ন প্রজাতি। বাংলাদেশে এখনও এদের অস্তিত্ব থাকলেও নদ-নদীতে দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণে তাদের আবাসস্থল ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

গাঙ্গেয় শুশুকের মাংস খাওয়ার বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে এটি খাওয়ার প্রচলন নেই এবং এ বিষয়ে মানুষেরও তেমন ধারণা নেই। কেউ এরই মধ্যে মাংস খেয়ে থাকলে কোনো সমস্যা হবে কি না, সে বিষয়ে এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

প্রাইমটিভি/এমআর