জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর পৌনে দুইটার দিকে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা চাইতে গিয়ে তাঁর বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার রাতে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে জেলায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। এর পরদিনই দুঃখ প্রকাশ করলেন হাসনাত।

কনসার্ট নিয়ে যা বললেন হাসনাত

ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতো—এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ও আলেমদের ওপর চাপানো হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধের ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, বাস্তবতা তার চেয়ে ভিন্ন ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। এ নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে পরবর্তী ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি, শুধু শব্দ কমাতে বলেছিল। তাই এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ—এমন ধারণা তৈরি হওয়া ঠিক নয়।

নৌকাবাইচ নিয়ে ভুল স্বীকার

নৌকাবাইচ বন্ধের প্রসঙ্গে নিজের তথ্যগত ভুলের কথাও স্বীকার করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, নৌকাবাইচ বন্ধের যে ঘটনাটি তিনি সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বলে উল্লেখ করেছিলেন, সেটি আসলে সিলেটের ঘটনা। এ ক্ষেত্রে তথ্যগত ভুল হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

হাসনাত বলেন, ‘নৌকাবাইচের বিষয়টিতে স্থান নিয়ে আমার তথ্যগত ত্রুটি হয়েছে। সিলেটের জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলি। এ ত্রুটিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’

তবে মূল ঘটনা এবং সেটি গণমাধ্যমে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিয়ে সংসদে আরও বিস্তারিত বলা তাঁর উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সম্পূরক প্রশ্নের জন্য সময় সীমিত থাকায় বিস্তারিত বলার সুযোগ পাননি বলে জানান।

‘বাংলাদেশ সবার’

পোস্টের শেষাংশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তিনি ও তাঁর দল জুলাইয়ের আদর্শ ধারণ করেন। তাঁর মতে, জুলাইয়ের আন্দোলন এমন একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত থাকবে এবং কেউ অন্যের ওপর নিজের মত বা দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিতে পারবে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মসজিদ, মন্দির, সংগীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসব—সবই থাকবে। মানুষ নিজের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো আয়োজনে অংশ নেবে, আর সরকার নিশ্চিত করবে যাতে কেউ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে।

হাসনাতের ভাষ্য, সরকার যদি মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সংসদে তিনি মূলত এই বিষয়টিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, জুলাই ছিল ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবার আন্দোলন এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করে এমন একটি সর্বজনীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই তাঁদের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।