বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাসহ প্রায় এক হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যার পাশাপাশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করা হলেও জামায়াত কখনো বিগত সরকারের সঙ্গে আপস করেনি। তিনি দাবি করেন, দলটি প্রকাশ্যে ও ধারাবাহিকভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) কাউন্সিল হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা।

শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কারও সঙ্গে গোপনে আপস করিনি, আবার দিনের বেলায় রাস্তায় নেমে ভিন্ন কথা বলিনি। স্বৈরাচারের অনুমতি নিয়েও আন্দোলন করিনি। যতটুকু সামর্থ্য ছিল, দফায় দফায় সেই শক্তি নিয়েই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।”

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন ছিল। সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর জামায়াত সিদ্ধান্ত নেয়, “হয় মরতে হবে, নয়তো বাঁচার মতো বাঁচতে হবে।” সে সময় কিছু রাজনৈতিক দল আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও জামায়াত নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার কৃতিত্ব নিজেদের না নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, এত শহীদ থাকা সত্ত্বেও জামায়াত কখনো দাবি করেনি যে আন্দোলনের মূল পরিকল্পনাকারী তারা ছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে দলটি নির্বাচনের দাবিও তোলেনি।

শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ৬ আগস্টের পর একদল মানুষ চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে চাঁদাবাজি বন্ধের অনুরোধ জানানো হলেও তাতে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যে কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল, বর্তমানে সেটি আরও খারাপভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, ব্যাংক, বীমা করপোরেশনসহ সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ চলছে এবং যোগ্যদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

জুলাই যোদ্ধারা রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই জীবন দিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ আবারও অন্ধকার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তবে জামায়াত সেই পথে হাঁটবে না। সংসদে শহীদ পরিবার ও সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের হত্যার বিচার দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশে বহু হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় পর হলেও হয়েছে। জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচারও যত সময় লাগুক, শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় জুলাই যোদ্ধা ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সংসদে সমাধান না এলে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে এবং বিএনপিও রাজনীতিতে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ ওই সময়ে আন্দোলনকারীরা সরাসরি জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিলেন।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এবং জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ট্রাইব্যুনালের জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে জুলাই গণহত্যার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। বিচার দ্রুত করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যারা জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস মুছে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এ সময় জুলাই আন্দোলনে আহতদের পাশে দাঁড়াতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা না করলে বর্তমান সরকারকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

অনুষ্ঠানে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মাকে লেখা একটি চিঠি পাঠ করে শোনান তাঁর নানা মো. সাঈদুর রহমান। তিনি বলেন, আনাস যে ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে জীবন দিয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। সঞ্চালনায় ছিলেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ, দেলোয়ার হোসেন ও ফখরুদ্দিন মানিক। এছাড়া অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক সচিব মাহবুবুল হক, আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, শহীদুল ইসলাম এবং আল নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব বক্তব্য দেন।