রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাম্প্রতিক দফায় দফায় হামলা ও মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের ভাষা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি দাবি করেন, রাকসুর বিরুদ্ধে ‘হামলা’ শব্দ ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করা হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাকসু ভিপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “এত মায়াকান্না করা যাবে না। আপনারা সাংবাদিকেরা যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। আপনারা অনেকে ছাত্রলীগকে ডিফেন্স করে নিউজ করেছেন। সেই সব সংবাদ আমরা সংগ্রহ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “আপনারা বলছেন আমরা হামলা করেছি। এটা কোন ধরনের কথা? তারা হামলা করেছে, আমরা প্রতিরোধ করেছি। ‘হামলা’ শব্দটি ব্যবহার করতে এত সমস্যা কেন? ছাত্রলীগের প্রতি এত মায়াকান্না কেন?”

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সংঘর্ষের সময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার বিষয়েও মন্তব্য করেন রাকসু ভিপি। তিনি বলেন, “লাইব্রেরির শিক্ষার্থীরা তো আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। অথচ সাংবাদিকদের মাথাব্যথা যেন শিক্ষার্থীদের চেয়েও বেশি। মনে হচ্ছে ২০-২৫ মিনিট পড়াশোনা ব্যাহত হওয়াই সবচেয়ে বড় ঘটনা।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, লাইব্রেরির শিক্ষার্থীদের নামে ছাত্রদল মানববন্ধন ডেকেছে এবং এর উদ্দেশ্য ছাত্রদলকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “প্রশাসন বিএনপিপন্থী বলে ছাত্রদল বা শিবিরের বিচার হবে না—এমন নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর যে-ই হামলা করুক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংবাদ সম্মেলনে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মারও সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আমি আপনাদের সাংবাদিকতা শেখাব না। তবে শব্দ দিয়ে যেমন মানুষকে গড়ে তোলা যায়, তেমনি ধ্বংসও করা যায়। আপনারা এটিকে ‘হামলা’ না বলে ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে কেন দেখতে পারেন না?”

এ সময় রাকসুর পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, রাকসু ভবন ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববার রাতে প্রক্টর দপ্তরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগে বলা হয়, একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলম প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ওই ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেন। এ ঘটনায় অভিযুক্তের পক্ষে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রক্টরের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

পরদিন সোমবার আবারও বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হলে অভিযুক্ত পক্ষের একজনকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে রাকসু ভবনে গিয়ে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন।

এর কিছু সময় পর আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নিলে সেখানে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তারা পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নেন। পরে সেখানে প্রবেশ করে তাদের ওপর দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ ওঠে।

মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম-সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদিকে পুরো ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।