সংসারের অভাব, ঋণের বোঝা আর একটি অটোরিকশা (বোরাক) কেনার স্বপ্ন পূরণের আশায় জীবনে প্রথমবার গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী মো. আক্কাস। কিন্তু সেই যাত্রাই যেন তার জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারডুবির তিন দিন পার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আক্কাসসহ ছয় জেলে।

গত রোববার রাতে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উত্তাল বঙ্গোপসাগরে প্রবল স্রোত ও কয়েক মিটার উঁচু ঢেউয়ের কবলে পড়ে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে দুজন বাইরে থাকলেও বাকি নয়জন ট্রলারের ব্রিজের ভেতরে আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে ছয়জন বের হতে পারলেও তিনজন বের হতে পারেননি। পরে পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও আক্কাসসহ ছয়জনের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি।

নিখোঁজরা হলেন—এমাদুল খাঁ (৪৫), হারুন হাওলাদার (৪৫), ফোরকান সিকদার (৫৫), সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) ও মো. আক্কাস (২৫)।

আক্কাসের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। তার ভাড়া বাসায় এখন স্বজনদের অপেক্ষা আর আহাজারি। মা শাহানাজ বেগম ছেলের ফেরার আশায় প্রহর গুনছেন। স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলভি বাবার অনুপস্থিতির অর্থ না বুঝে শুধু বলছে, “বাবাকে নিয়ে আসো।”

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন আক্কাস। পরে গলাচিপায় ফিরে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেন। প্রায় ৬০ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধ এবং একটি বোরাক কেনার স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রথমবারের মতো জেলেদের সঙ্গে গভীর সাগরে মাছ ধরতে যান তিনি।

আক্কাসের খালা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. ফারআনা বলেন, ঋণের চাপ থেকেই আক্কাস সমুদ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম সমুদ্রযাত্রাই তাকে নিখোঁজের তালিকায় ঠাঁই করে দিয়েছে।

স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম বলেন, “অভাবের কারণে ওর আর কোনো উপায় ছিল না। ঋণের টাকা শোধ করতেই প্রথমবার সাগরে গিয়েছিল। ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। এখন শুধু চাই, অন্তত ওর একটা খোঁজ যেন পাই।”

নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকে কুয়াকাটা উপকূলের গঙ্গামতি, হাসাখালী, চাপালীসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন আক্কাসের শ্বশুর হানিফ মিয়া। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা, যদি জীবিত ফিরে না-ও আসেন, অন্তত যেন আক্কাসের মরদেহটি উদ্ধার করা যায়।

প্রাইমটিভি/এমএইচ