ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি লড়াই খুব বেশি হয়নি। তবে যতবার দুই দল মাঠে নেমেছে, প্রায় প্রতিবারই জন্ম দিয়েছে আলোচিত কোনো ঘটনা। ‘হ্যান্ড অব গড’, ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, মরিসিও পচেত্তিনোকে ঘিরে বিতর্কিত পেনাল্টি কিংবা আন্তোনিও রাতিনের বহিষ্কার—এসব মুহূর্ত দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

১. ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে হাতে বল স্পর্শ করে জালে পাঠান ডিয়েগো ম্যারাডোনা। রেফারি গোলটি বৈধ ঘোষণা করলে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। পরে ম্যারাডোনা এই গোলকে বিখ্যাত করে তোলেন ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে।

এর মাত্র চার মিনিট পর প্রায় ৬০ গজ দূর থেকে একক নৈপুণ্যে চারজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে করেন আরেকটি অবিশ্বাস্য গোল, যা পরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। এরপর ফাইনাল জিতে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তেরা।

২. বেকহামের লাল কার্ড

১৯৯৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত লড়াই। প্রথমার্ধে ২-২ সমতা থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিশোধমূলক আচরণের কারণে লাল কার্ড দেখেন ডেভিড বেকহাম।

১০ জন নিয়ে খেলেও ইংল্যান্ড ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় ইংলিশদের।

৩. পচেত্তিনোর ফাউল, বেকহামের জয়সূচক পেনাল্টি

২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুই দলের ম্যাচে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় একটি পেনাল্টিকে ঘিরে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মরিসিও পচেত্তিনোর বিরুদ্ধে মাইকেল ওয়েনকে ফাউলের সিদ্ধান্ত দেন কিংবদন্তি রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা।

সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন ডেভিড বেকহাম। একমাত্র ওই গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট পর্বে ওঠে ইংল্যান্ড, আর গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

পরে পচেত্তিনো দাবি করেন, ওয়েন ডাইভ দিয়েছিলেন এবং তিনি কোনো ফাউল করেননি।

৪. এক ঘুষিতে ভেঙে যায় দুই দাঁত

১৯৭৭ সালে বুয়েনস আইরেসের লা বোম্বোনেরায় অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি আর্জেন্টিনার দানিয়েল বার্তোনিকে কঠোর ট্যাকল করলে ক্ষুব্ধ হয়ে বার্তোনি সরাসরি চেরির মুখে ঘুষি মারেন।

ঘটনায় চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। পরে দুজনকেই লাল কার্ড দেখান রেফারি। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড দেখা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান ট্রেভর চেরি।

৫. রাতিনের বহিষ্কার, বদলে যায় ফুটবলের নিয়ম

১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েম্বলিতে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। তবে ভাষাগত সমস্যার কারণে সিদ্ধান্ত বুঝতে না পেরে রাতিন দোভাষীর দাবি জানান এবং প্রায় ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়।

সে সময় ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ফুটবলে কার্ড ব্যবস্থা চালুর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ শুধু দুটি দলের লড়াই নয়, বরং বিতর্ক, আবেগ, প্রতিশোধ ও ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রাইমটিভি/এমএইচ