ময়মনসিংহে যুবলীগের এক কর্মীকে বিপুল পরিমাণ ঘুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ওরফে ইতিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর আফরোজাকে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফরোজা শেখ নিহত যুবলীগ কর্মী শফিকুল ইসলাম ওরফে সপুর (২৫)-এর দ্বিতীয় স্ত্রী। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় তাঁকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যত খুশি মন চায় ভিডিও করেন, দেহুক সবাই।”

রায়ের পর নিহত শফিকুল ইসলামের মা ও মামলার বাদী নুরুন্নাহার অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তিনি আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর তিন দিন ধরে খোঁজাখুঁজির নাটক করেছিলেন আফরোজা। তিনি আরও দাবি করেন, রায় ঘোষণার পরও আসামি হাসতে হাসতে বলেন, “চিন্তা কইরো না, আমি আবার আইতাছি। আবার আয়া খেলবাম।” এ ঘটনায় পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।

আদালত সূত্রে জানা যায়, নগরের বাঁশবাড়ী কলোনির বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম প্রথমে মাহমুদা আক্তারকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে। পরে প্রথম বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে আফরোজা শেখকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে আফরোজা জানতে পারেন, শফিকুল প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহের জেরে ২০১৯ সালের ১০ জুন পরিকল্পিতভাবে প্রায় ২০০টি ঘুমের ওষুধ খাইয়ে স্বামীকে অচেতন করেন আফরোজা। পরে ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহ কাঁথায় পেঁচিয়ে বাড়ির পাশের একটি পচা পুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখেন।

ঘটনার তিন দিন পর স্থানীয়রা পুকুরে মানুষের একটি হাত ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ১৩ জুন নিহতের মা নুরুন্নাহার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আফরোজা শেখ ও তাঁর বড় ভাই দীন ইসলামকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আফরোজা শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. আকরাম হোসেন এবং আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান। মামলায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এ রায় দেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, আসামি একজন নারী এবং তাঁর একটি সন্তান রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের দাবি, আফরোজা শেখ নির্দোষ এবং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁর ভাই শেখ সাব্বির জানান, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।